পৃথিবীর ইতিহাসে ‘নিষিদ্ধ বই’

 

  • পৃথিবীর ইতিহাসে বহু বিখ্যাত লেখকের বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা হয়েছে দীর্ঘ। আবার নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনেক বই হয়েছে বিখ্যাত। নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে আছে ধর্ম, দাসপ্রথা, বর্ণপ্রথা, অশ্লীলতা সহ নানা কারণ। কিছু বইয়ের জন্য লেখকদের দাঁড়াতে হয়েছে কোর্টে, মামলা চালাতে হয়েছে দিনের পর দিন, ছাড়তে হয়েছে দেশ।


বাইবেল: উইলিয়াম টেইন্ডাল অনূদিত

অশ্লীলতার দায়ে প্রথম নিষিদ্ধ হয় যে বইটি সেটি বাইবেল। ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত উইলিয়াম টেইন্ডাল অনূদিত বাইবেল নিষিদ্ধ করেন তৎকালীন রাজা অষ্টম হেনরি। অষ্টম হেনরি নিজের জীবনের বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে বিস্তর ঝামেলায় পড়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন কোথাও যেন বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা না হয়। ফলে বাইবেলের বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা তিনি নিতে পারেননি। পরিশেষে পুড়িয়ে ফেলা হয় অনূদিত বাইবেলের ছ’হাজার কপি। শুধু তাই নয় টেইন্ডালকে দেশত্যাগ করতে হয়েছিলো। বর্তমানে সেই অনূদিত বাইবেলটিই পুরো বিশ্বের খ্রিস্টান ধর্মানুসারি মানুষ অনুসরণ করছে।

দ্য রামায়াণ অ্যাজ টোল্ড: অব্রে মেনেন

‘দ্য রামায়ানা অ্যাজ টোল্ড বাই অব্রে মেনেন’ নিষিদ্ধ ঘোষিত আরেকটি ধর্মীয় গ্রন্থ। আধুনিক আঙ্গিকে রামায়ণকে ব্যাখ্যা করায় গ্রন্থটি নিষিদ্ধ করা হয়। দেব দেবীকে মানবরূপে উপস্থাপনের কারণে ভারত সরকার গ্রন্থটি ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরিফিন’: মার্ক টোয়েন

মার্ক টোয়েন রচিত কিশোর উপন্যাসটি ভাষার অজুহাত দেখিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত এ বইয়ের শ্বেতাঙ্গ হাকলবেরির সাথে কালো জিমের বন্ধুত্বের গল্প থাকায় মেনে নিতে পারেনি শ্বেতঙ্গ শাসকেরা। বর্তমান বিশ্বে ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিন’খুবি জনপ্রিয়।

আঙ্কেল টম’স কেবিন: হেরিয়েট বিচার স্টো

দাসপ্রথার বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হানে হেরিয়েট বিচার স্টো রচিত ‘‘আঙ্কেল টম’স কেবিন’’ উপন্যাসটি। দাসত্ববিরোধী উপাদান থাকায় কনফেডারেট স্টেটস-এ বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮৫২ সালে বইটি রাশিয়াতেও নিষিদ্ধ করা হয় এর ‘সাম্যবাদী’ তত্ত্বের কারণে।

‘ইউলিসিস’: জেমস জয়েস

জেমস জয়েস ১৯০৪ সালের জুন মাসে মাত্র ১৮ ঘন্টার ঘটনা নিয়ে ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসটি লিখেন। উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর অশ্লীলতার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পুড়িয়ে ফেলা হয় উপন্যাসটির ৪৯৯ কপি। বইটি কেবল উপন্যাস নয় জীবন্ত ইতিহাসও। বর্তমানে উইলিসিস সেরা উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি।

‘এনিমেল ফার্ম’: জর্জ অরওয়েল

জর্জ অরওয়েলের ‘এনিমেল ফার্ম অ্যা ফেয়রি টেল’ বইটি মূলত সাংকেতিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে রাশিয়ার স্টালিন যুগের ভয়াবহতাকে তুলে ধরা হয়েছিল। বইটি রাশিয়ায় নিষিদ্ধ হয়। ১৯৯১ সালে কেনিয়ায় নিষিদ্ধ করা হয় ‘এনিমেল ফার্ম’ অবলম্বনে তৈরি নাটক কারণ এটিতে দুর্নীতিপরায়ণ নেতাদের ব্যাঙ্গ করা হয়। ২০০২ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্কুলগুলোতে নিষিদ্ধ হয়। কারণ এই বইটি ছবি সংবলিত, বিশেষ করে শুকর কথা পারায়। বইটি এখনো দক্ষিণ কোরিয়া ও কিউবায় নিষিদ্ধ।

ট্রপিক অব ক্যান্সার: হেনরি মিলার

ট্রপিক অব ক্যান্সার মার্কিন ঔপন্যাসিক হেনরি মিলার রচিত একটি উপন্যাস যা প্রথমে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে একটি মার্কিন ক্ল্যাসিক সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এতে মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং যৌনকর্মের বিস্তর বর্ণনা থাকায় প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২৭ বছর নিষিদ্ধ ছিল থাকার পর সুপ্রিম কোর্ট ১৯৬৪ সালে উপন্যাসটিকে অশ্লীলতার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়।

দ্য স্যাটানিক ভার্সেস: সালমান রুশদি

‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ সালমান রুশদির উপন্যাস। উপন্যাসটি ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই মুসলিম বিশ্বে ঝড় তোলে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে এক বছর পরই বইটি নিষিদ্ধ হয়। স্যাটানিক ভার্সেস লেখার অপরাধে ১৯৮৯ সালে ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি রুশদির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড জারি করে ফতোয়া দেন। তখন মুসলিমদের বিক্ষোভ ও দাঙ্গার পর ভারতে তার উপন্যাস নিষিদ্ধ করা হয়। এ বইটির জন্য অনেকে হত্যা ও হামলার শিকারও হয়েছেন। হিতোশি ইগারাশি স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসটির জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। তাকে ১৯৯১ সালে তাকে ছুরিকাঘাতে মেরে ফেলা হয়। ইতালির অনুবাদক ইতোরে ক্যাপ্রিওলোকেও ছুরিকাঘাত করা হয়, তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। নরওয়ের প্রকাশক উইলিয়াম নাইগার্ডকেও আততায়ীরা গুলি ছোঁড়ে, কিন্তু অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি।

আমেরিকান সাইকো: ব্রেট এস্টন এলিস

‘আমেরিকান সাইকো’ ব্রেট এস্টন এলিসের বিখ্যাত উপন্যাস। সেক্স, ভায়োলেন্স আর সাইকোপ্যাথির মিশেলে একটা উপন্যাস। উপন্যাসের মূল চরিত্র ২৭ বছর বয়সী প্যাট্রিক কাজ করে ওয়ালস্ট্রিট কোম্পানিতে। সে একে একে খুন করে কলিগ থেকে শুরু করে বান্ধবী পর্যন্ত। ভয়ঙ্কর মানসিক বিকারগ্রস্ত একজন সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠে প্যাট্রিক। ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত বইটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়নি। জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ায়ও নিষিদ্ধ ছিল। এরপর নিষেধাজ্ঞ তুলে নিলেও শর্ত দেয়া হয় যে, ১৮ বছরের কম বয়সি কারও কাছে এটি বিক্রি করা যাবে না। ২০০০ সালে বইটি অবলম্বনে নির্মান করা হয় একটি সিনেমা।

‘ইভস ডায়েরি’: মার্ক টোয়েন

মার্ক টোয়েনের এই বইটির ওপর শতবর্ষ আগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের চার্লটন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়েছে। নগ্ন চিত্রকর্ম থাকায় কর্তৃপক্ষ ১৯০৬ সালে ইভস ডায়েরি বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বইটিতে আদম-ইভ এর কাহিনী তুলে ধরেন।

ললিতা: ভ্লাদিমির নবোকভ

ভ্লাদিমির নবোকভের লেখা একটি উপন্যাস ‘ললিতা’। লেখক প্রথমে ইংরেজি ভাষায় উপন্যাসটি রচনা করেন। একজন বিবাহিত মধ্যবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে একটি ১২ বছর বয়সী বালিকার যৌন সংসর্গের ঘটনা হলো এই উপন্যাসটির মূল উপাদান। উপন্যাসটি ১৯৫৫ সালে প্যারিসে এবং ১৯৫৮ সালে নিউইয়র্কে প্রকাশিত হওয়ার পর অশ্লীলতার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়।

‘বিশ্ববিধান সম্পর্কে কথোপকথন’: গ্যালিলিও

চার্চের ধর্মগুরুদের ধারণা ছিল পৃথিবী স্থির এবং অন্যসব গ্রহ নক্ষত্র পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু গ্যালিলিও তাঁর ‘বিশ্ববিধান সম্পর্কে কথোপকথন’ গ্রন্থে বললেন, পৃথিবী সহ অন্যসব গ্রহ নক্ষত্র সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। চরম সত্য কথাটি চার্চের বিরুদ্ধে চলে যায়। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ পোপ অনির্দিষ্টকালের জন্য গ্যালিলিওকে বন্দী করার নির্দেশ দেন। ১৬৪২ সালে গ্যালিলিওর বন্দী অবস্থায় মৃত্যু হয়। তবে বন্দী দশা থেকে এক কপি চালান করে ছিলেন স্ট্রসবুর্গ-এ; যা পরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। গ্যালিলিওর সেই বিশ্ববিধান জোর্তিবিদ্যার আমূল বদলে দিয়েছে।

প্রজাপতি : সমরেশ বসু

সমরেশ বসুর “প্রজাপতি” অশ্লীলতার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এবং ১৮ বছর বন্ধ রইল এর প্রকাশ। লেখক বুদ্ধদেব বসু আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “ যৌনতার কারণে ‘প্রজাপতি’ নিষিদ্ধ হলে বাইবেল মহাভারতেকেও নিষিদ্ধ করতে হয়।” পরে বইটির উপর থেকে সকল আইনি বাধা তুলে নেয় হয়।

অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস: আরনেস্টহেমিংওয়ে

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আধা-আত্মজীবনীমূলক এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে ইটালিতে। উপন্যাসটিতে কাপোরেত্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ইতালীয় সৈন্যদের পিছু হটার ঘটনাটি ভীরুতা হিসেবে উল্লেখ এবং অশ্লীলতার দায়ে সেই সময়কার আদালত বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এলিস‘স অ্যাডভেঞ্চার ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড : লুইসক্যারল

বইটি চীনে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অদ্ভুত একটি কারণে চীনা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয় ১৯৩১ সালে। হানান প্রদেশের একটি আইন ছিল যে, কোন পশুর কণ্ঠে কোনভাবেই মানুষের ভাষা তুলে দেওয়া যাবে না এতে পশুকে মানুষের সমমর্যাদায় নিয়ে আসা হবে। কিন্তু বইটিতে বিড়াল, মানুষের মতো করে কথা বলতে পারে আর এজন্যেই বইটি নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক জার্মান সৈনিক যিনি পরবর্তীতে পৃথিবীর সবচেয়ে অনুভূতিপ্রবণ ঔপন্যাসিকদের একজন হয়ে ওঠেন- তিনি এরিক মারিয়া রেমার্ক। তার রচিত বিখ্যাত যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস- অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট (মূল নাম- ইম ওয়েস্তেন নিখৎস নুয়্যেস)- সে সময়ে জার্মানির সমরনীতি ও যুদ্ধের বীভৎসতার দিকে দুঃসাহসিক আঙুল তুলেছিল। ১৯২৯ এ প্রকাশিত এ বইটিকে নিষিদ্ধ করেছিল জার্মান সরকার। অতঃপর ১৯৪১ এ আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়।

হিস্ট্রি অব ইটালি: থমাস উইলিয়াম

১৫৫৪ সালে প্রকাশিত থমাস উইলিয়ামের (Thomas William) “হিস্ট্রি অব ইটালি” বইটি তৎকালীন ধর্মযাজকদের অনৈতিক কাজের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে। তখনকার সময়ে যেহেতু চার্চই ছিল সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান তাই ধর্মযাজকদের দাপটও ছিল উচ্চপর্যায়ে। কেউ যেন কখনও যাজকদের অনৈতিকতা তুলে ধরতে না পারে তার দৃষ্টান্ত সরূপ থমাসকে টুকরা টুকরা করে কেটে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল।

লেডি চ্যাটারিজ লাভার:

ডি এইচ লরেন্স এর বইটিতে ঘন ঘন fuck ও sex শব্দ দুটি ব্যবহৃত হওয়ায় বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। পরে অবশ্য বইটি নির্দোষ প্রমাণিত হয়।

ক্রয়টজার সোনাটা

লিও টলস্টয় এই বই লেখার আগে কোন বিতর্কে ছিলেন না। তবে এই বইয়ের কাহিনি এরকম যে-এক স্বামি তার স্ত্রীকে খুন করেন স্ত্রীর পরকিয়ায় ঈর্ষান্বিত হয়ে। বইটি এখনও নিষিদ্ধ তালিকায় অবস্থান করছে।

সূত্র : ইন্টারনেট ও প্রিন্ট মিডিয়া

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ল্য দোজিয়েম সেক্স/দি সেকেন্ড সেক্স/শি লিঙ্গ

শহীদ জিয়ার জীবন রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ / সুশোভন ইফতেখার শাওন

সময় এসেছে বইমেলা নিয়ে ভাববার