শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী / সুশোভন ইফতেখার শাওন
এক স্মরণীয় শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী। তিনি ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি বিক্রমপুরের ধাইদা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। মোহাম্মদ নাসির আলী যখন সাহিত্যচর্চায় নিজেকে প্রকাশ করেন তখন মুসলিম জাগরণের যুগ। শিশুসাহিত্য চর্চাও তখন একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্য-ইরানের গল্প অনুকরণ-পুনর্কথনসহ ইসলামিক ভাবধারায় বন্দি, অন্যদিকে অবাস্তব ভূত-পেত্নীর লোকগল্প ও রূপকথার চর্চা চলছিল। এই একঘেয়ে গতানুগতিক ধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি মোহাম্মদ নাসির আলী। তিনি বাস্তবতার সঙ্গে আধুনিক চিন্তা-চেতনার সংমিশ্রণে চমক সৃষ্টির মাধ্যমে শিশু-কিশোর পাঠকদের আকর্ষণ করতে চেষ্টা করেছেন সব সময়। ছাত্র হিসেবে মোহাম্মদ নাসির আলী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯২৬ সালে গণিত বিষয়ে স্বর্ণপদকসহ তার জন্মস্থান ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার ধাইদা গ্রামের তেলীরবাগ কালীমোহন-দুর্গামোহন ইনস্টিটিউশন থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩১ সালে বিকম পাস করেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পাঠ করতেন এবং সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। শিক্ষাজীবন শেষে মোহাম্মদ নাসির আলী কলকাতা শহরে যান কাজের সন্ধানে। কলকাতা হাইকোর্টের অনুবাদ বিভাগে চাকরি নেন। এ সময় তিনি লেখালেখি সূত্রে দৈনিক ইত্তেহাদ, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী এবং সওগাত পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। আজাদ পত্রিকার মুকুলের মহফিলও তিনি পরিচালনা করেন। ১৩৪৬ সালের মুসলিম রেনেসাঁ আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। মোহাম্মদ নাসির আলীর লেখা প্রথম বই প্রকাশিত হয় আমিনা মেহের ছদ্মনামে। ‘লেখাপড়া’ শিরোনামের এই বইটি ছিল একটি পাঠ্যবই। এটি অবিভক্ত বাংলায় প্রথম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্বাচিত হয়। নিজের নামে তার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৩৫৬ সালে। তার প্রকাশিত মোট বইয়ের সংখ্যা ৪০টিরও বেশি। তার ভাষা যেমন সহজ, সাবলীল ও বিষয়োপযোগী; তেমনি রচনাভঙ্গিও গতিময়। মৌলিক রচনার মতো অনুবাদকর্মেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।
তার উল্লেখযোগ্য বই হলো ‘লেবু মামার সপ্তকাণ্ড’ (১৯৬৮), ‘ভিনদেশী এক বীরবল’ (১৯৭৯), ‘আকাশ যারা করল জয়’ (১৯৫৭), ‘আলীফ লাইলার গল্প’, ‘একটি কুকুরের কাহিনী’, ‘ভিনদেশী গল্প’, ‘মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা’, ‘তিমির পেটে কয়েক ঘণ্টা’, ‘বোকা বকাই’ (১৯৫৬), ‘ইবনে বতুতার সফরনামা’ (১৩৭৫), ‘ইতালির জনক গ্যারিবল্ডি’ (১৯৬৩), ‘আলবার্ট আইনস্টাইন’, ‘সাত পাঁচ গল্প’ (১৯৬৫), ‘টলস্টয়ের সেরা গল্প’ (১৯৬২), ‘যোগাযোগ’ (১৯৬৮) ইত্যাদি।
পুস্তক রচনার পাশাপাশি রুচিশীল পুস্তক প্রকাশনার প্রতিও মোহাম্মদ নাসির আলীর প্রবল আগ্রহ ছিল। ১৯৪৪ সালে তার বন্ধু আইনুল হক খানের সঙ্গে যৌথভাবে ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ নামে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঢাকার ৪৬ পি. কে. রায় রোডের ঘুপচি ঘরে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে গ্রন্থ প্রকাশনা সম্পর্কে করাচি থেকে ইউনস্কো ট্রেনিং গ্রহণ করেন।
তিনি ভালো ছবি আঁকতে পারতেন এবং ফটোগ্রাফি কাজেও তার প্রশংসনীয় দক্ষতা ছিল। শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মোহাম্মদ নাসির আলী বেশকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হন। তিনি ১৯৬৭ সালে শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৬৮ সালে ইউনেস্কো এবং একই বছরে ইউনাইটেড ব্যাংক অব পাকিস্তান পুরস্কার লাভ করেন। তবে একজন সত্যিকারের সাহিত্যিক বা শিল্পীর ক্ষেত্রে পুরস্কার বা সম্মাননা অর্জনই কেবল সাফল্যের মাপকাঠি নয়, পাঠকপ্রিয়তা অর্জনই বড় কথা। এদিক থেকে বিচার করলে মোহাম্মদ নাসির আলী অত্যন্ত সফল শিশুসাহিত্যিক। ১৯৭৫ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়। তার চমকপ্রদ সরস সৃষ্টিসম্ভার অমর করে রেখেছে তাকে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন