বাংলায় কালের বিবর্তন/সুশোভন ইফতেখার শাওন

ছবি : ভিস্তিওয়ালা

কালের বিবর্তনে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া কিছু বৈচিত্র্যময় পেশা।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে সমাজ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন পেশার। অতীতের অনেক জনপ্রিয় পেশাই এখন বিলুপ্ত। এমন কিছু পেশা নিয়েই আজকের আলোচনা-

রানার/ ডাকহরকরা:
চিঠির গুরুত্ব অনেকটাই কমে এসেছে। চিঠির গুরুত্ব কমে আসায় কমে গেছে এর সঙ্গে জড়িত মানুষদের গুরুত্বও। কোন সময় থেকে রানারদের এই 'দৌড়' শুরু, তা সঠিক জানা যায় না। তবে মনে করা হয়, মুঘল যুগ থেকেই এই যোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা। প্রথমদিকে রাজাবাদশাদের প্রশাসনিক কাজের জন্য রানারদের নিয়োগ করা হতো। তারপর বণিকদের বাণিজ্য-সংক্রান্ত কাজেও রানাররা নিয়োজিত হতেন। খুব প্রত্যন্ত অঞ্চলেই কাজ করতেন এই রানাররা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করে চিঠির বোঝা পৌঁছে দিতেন অন্য আরেক রানারের হাতে।

বাইজি:
এক সময়ে বাইজিরা ধনিক শ্রেণির মনোরঞ্জনের অন্যতম মাধ্যম ছিল। বিশেষ ধরনের জীবনযাপন করতেন তারা। এ কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাইজিদের সম্পর্কে অনেক কৌতূহল ছিল। ইংরেজ শাসন স্থায়ী হওয়ার পর এ পেশায় ধস নামে। ঢাকার বাইজি পাড়ায়ও লাগে এর হাওয়া। নবাব, জমিদারদের আয়ের উৎস কমে যেতে থাকে। তাদের আর পৃষ্ঠপোষকতা করা সম্ভব হয়নি। ঢাকায় নব্য ধনিক শ্রেণির জন্ম হয়। তারা বাইজিদের নাচ উপভোগের চেয়ে বলড্যান্স উপভোগ করতে বেশি উৎসাহী হয়ে উঠে। ভিসিআর এবং সিনেমার মত বিনোদন এ পেশার শেষ পরিণতি ডেকে আনে। হারিয়ে যায় বাইজিরা।

দাস্তানগড়িয়া:
এদের কাজ ছিল মূলত গল্প বলা। লোক সমাগম হয় এমন জনবহুল জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প বলতেন তারা আর মানুষ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে তা শুনতেন। রাজা বাদশার গল্প বা লৌকিক উপকথা সুন্দর বাচনভঙ্গির মাধ্যমে তারা মুগ্ধ করতেন শ্রোতাদের। কালের বিবর্তনে আজ বিলুপ্ত এ পেশা।

বায়স্কোপ:
কী চমৎকার দেখা গেল এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেল।’- এ সুর আর ছন্দের তালে তালে ধারা বিবরণী বায়োস্কোপওয়ালার। আর তা দেখে যেন গল্পের জগতে হারিয়ে যেতো ছেলে বুড়ো সবাই। বায়োস্কোপ বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্য। কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে গানের তালে ছবি দেখার দৃশ্য আর চোখেই পড়ে না। দাস্তানগড়িয়ার একটি পর্যায় বায়োস্কোপ। বায়োস্কোপে গল্পের পাশাপাশি কয়েকটি স্থিরচিত্রও দেখানো হতো। 

পুঁথিপাঠ:
কে আর শোনে আজকাল পুঁথিপাঠ। নানা বর্ণে আনন্দে ঝড়-ঝঞ্ঝায় আবর্তিত জীবনের খুনশুটি আঁচলে বাঁধা ছিল কিছু পুঁথির কথামালা। যারা পড়তে পারতেন তারাই রাতে পুঁথি পড়তেন, আর অন্যরা দলবেঁধে শুনতেন। এর জন্য কোনো টাকা পয়সা নেওয়া হতো না। মহররম, প্রেম-বিচ্ছেদ আরও কত কাহিনী সুর করে শুনানো হতো শ্রোতাদের। বর্তমানে বিনোদন জগৎ সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে এই পেশা।

পালকি বেহারা:
পালকি ছিল এক সময়ে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন বাহন। মানুষ বহন করার কাজেই মূলত এর ব্যবহার হতো। সাধারণত ধনীগোষ্ঠী ও সম্ভ্রান্ত বংশের লোকেরা এর মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতেন। বিয়েতে ব্যবহৃত হতো পালকি। কিন্তু এখন তা প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্ত।

ভিস্তিওয়ালা:
১৮৭৮ সালে ঢাকা শহরে আধুনিক সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়। এর আগে ঢাকায় খাবার পানির উৎস ছিল পুকুর, কুয়া, নদী। সে সময় কিছু লোক টাকার বিনিময়ে মশকে (চামড়ার ব্যাগ) করে ঢাকা শহরের বাসায় বাসায় খাবার পানি পৌঁছে দিতেন। এ ধরনের পেশাজীবীদের বলা হত 'ভিস্তিওয়ালা' বা 'সুক্কা'। আর ভিস্তিওয়ালা বা সুক্কারা পুরান ঢাকার যে এলাকায় বাস করতেন সেটি কালক্রমে 'সিক্কাটুলি' নামে পরিচিত হয়।

পাঙ্খাওয়ালা:
হাতপাখা নির্ভর এই পেশাজীবীরা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাজা-জমিদারদের আমলে এই পেশাজীবীদের অনেক কদর ছিল। বড় আকারের তালপাখার নাম ছিল আরানি, ছোটগুলোর নাম আরবাকি। নিরবিচ্ছিন্ন পাখা টানার কাজ করতো তারা। বৈদ্যুতিক জীবনে পদার্পণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ইতি টেনে দিয়েছে এ পেশার।

নৈচাবন্দ:
হুঁকা এক সময় খুব জনপ্রিয় ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হুঁকা নামের ধূমপানের বস্তুটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু একসময় ঢাকা শহরেই ছিল উপমহাদেশের বৃহত্তম হুঁকা বানানোর শিল্প। হুঁকার নল যারা বানাতো তাদের বলা হতো 'নৈচাবন্দ'। ঢাকার নৈচাবন্দরা মূলত আসতো সিলেট থেকে। শিশু, জাম, জারুল, শিমুল কাঠ দিয়ে নৈচা বানানো হতো।

টিকাওয়ালা:
আজকের ঢাকার যে টিকাটুলি এলাকা তা ছিল মূলত হুঁকার টিকাদারদের আবাসস্থল। টিকাটুলির এ টিকাদাররা অতিসাধারণ টিকিয়াকে অসাধারণ শিল্পে পরিণত করেছিল। তাদের তৈরি টিকিয়ার কোনো তুলনা ছিল না। এগুলো এতো হাল্কা ও দাহ্য ছিল যে, দিয়াশলাইয়ের একটা শলা দিয়েই অনেকগুলো টিকিয়াতে আগুন ধরানো যেতো। হুক্কার প্রচলন বিলুপ্ত হওয়ায় বিলুপ্ত হয়েছে এ পেশাটিও। 

বাতিওয়ালা:
বর্তমানে বাতিওয়ালা ঢাকার বিলুপ্ত পেশা। একসময় রাত হলেই ঢাকা ঘুটঘুটে এক অন্ধকার শহরে পরিনত হতো। ঢাকার রাস্তার পাশে কেরোসিন বাতি জ্বালানো শুরু হয় ১৮৭৭ সালে। হঠাৎ করেই ঢাকা শহরে এক নতুন পেশাদার শ্রেণির উদ্ভব হয়। বাতিওয়ালারা প্রতি সন্ধ্যায় মই বেয়ে ল্যাম্প পোস্টে উঠে সঙ্গে আনা কেরোসিন ভরে সেগুলোতে আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যেত। ঢাকার শেষ বাতিওয়ালার নাম দক্ষিণারঞ্জন রাউত। ১৯৫২- ১৯৫৩ সালের পরে এই ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর তিনি ওই পেশা থেকে অবসর নেন।

লেখা ও সংগ্রহ : সুশোভন ইফতেখার শাওন

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ল্য দোজিয়েম সেক্স/দি সেকেন্ড সেক্স/শি লিঙ্গ

শহীদ জিয়ার জীবন রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ / সুশোভন ইফতেখার শাওন

সময় এসেছে বইমেলা নিয়ে ভাববার