মোহাম্মদ নাসির আলীর ১১৪তম জন্মবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলী/সুশোভন ইফতেখার
মোহাম্মদ নাসির আলী (১৯১০-১৯৭৫)
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের কথা উঠলে যেসব স্রষ্টার কথা প্রথমেই আমাদের মনে আসে, অনিবার্য ভাবেই তাদের একজন মোহাম্মদ নাসির আলী (১৯১০-১৯৭৫)। তাঁর সম্পর্কে কিছু ভাবতে গেলে আমরা বেদনার সাথে অনুভব করি, তাও অনিবার্য ভাবেই,—এমন লেখককে নিয়ে স্মৃতিচারণ বা জন্ম-মৃত্যুর উপলক্ষ ছোয়া দু'চারটি রচনা প্রকাশিত হয়েছে যদিও, তিনি আমাদের কাছে রয়ে গেছেন বস্তুত উপেক্ষিত। তাঁর শিশুসাহিত্য কৃতির মূল্যায়ন তো দূরের কথা, তার মোটামুটি একটা পরিচয় লাভের চেষ্টাও আমরা কখনো করিনি। অথচ তিনি যে দূর অতীতের কোনো লেখক এবং তাই তাঁর রচনাবলী এখন দুর্লভ আর অপঠিত, তাও কিন্তু নয়। বরং তাঁর অনেক গ্রন্থই আজও সহজলভ্য এবং সেগুলির মাধ্যমে তিনি যথেষ্ট পরিচিত ও জনপ্রিয়।
মোহাম্মদ নাসির আলীর এই জনপ্রিয়তার সূচনা ঘটে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে, তার পূর্ববর্তী দশকের একেবারে শেষ দিকে প্রকাশিত কয়েকখানি গ্রন্থের বুনিয়াদে। তিনি অবশ্য সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন কৈশোরে এবং তাঁর রচনা যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন তিনি ছিলেন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। শেষোক্ত ঘটনাটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। তাও আবার একাধিক কারণে। রচনার প্রথম প্রকাশ অমন বয়সে খুব কম লেখকই দেখবার সুযোগ পান এবং পেলেও তার মূলে থাকে সাধারণত স্থানীয় কোনো পত্রিকা বা স্কুলের ম্যাগাজিন জাতীয় প্রকাশনার উদার পৃষ্ঠপোষণ। কিশোর মোহাম্মদ নাসির আলী কিন্তু এক লাফেই পৌঁছে গিয়েছিলেন মোটামুটি হিসেবে পরিচিত এবং দূর থেকে প্রকাশিত এক সাহিত্য পত্রিকায়। এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর প্রথম প্রকাশিত শিশুবোধ গদ্য রচনাটি স্থান পায় একটি সুবিখ্যাত প্রকাশনায়, ১৯২৭ সালের বার্ষিক "শিশুসাথী"-তে, যখন তার বয়স মাত্র সতেরো বছর। সেটি ছিলো তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনার মতোই গল্প।
"শিশুসাথী"-তে সেই গল্পটি প্রকাশের সময় এবং তার পরেও বেশ কিছু কাল, উনিশশো তিরিশের দশকে মোহাম্মদ নাসির আলী পাঠকমহলে পরিচিত ছিলেন প্রধানত বয়স্বজনের লেখক হিসেবে, পাঠকেরা তাকে জানতেন গল্পকার বলে। তাঁর সাহিত্যচর্চা অবশ্য চলছিলো ছোট-বড়, দুই শ্রেণীর পাঠকের জন্যই। তখন তাঁর শিশুবোধ রচনা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম "শিশু সওগাত", বড়দের রচনার "মাসিক মোহাম্মদী"। সে আমলে "শিশু সওগাত"-এ তিনি প্রকাশ করেন ইসলামের ইতিহাস থেকে সংগৃহীত চুয়াল্লিশটি কাহিনী ধারাবাহিক ভাবে "মণিকথা" নাম দিয়ে। পরবর্তী কালে যেগুলি গ্রন্থাকারে পাঠকদের হাতে আসে "মণি-কণিকা" নাম নিয়ে। "শিশু-সওগাত"-এ তার আর এক অবদান। "মনিকনার" পরে, "বোকা বকাই" নামের একখানি উপন্যাস। কিন্তু সে-উপন্যাস তাঁর একক রচনা প্রয়াসের ফল নয়। "বোকা বকাই"-এর লেখক হিসেবে তার নামের সাথে দেখা গেছে আহসান হাবীবের নাম। কারন মোহাম্মদ নাসির আলীর অনুরোধে বন্ধু স্বজন আহসান হাবীব উপন্যাসের মিল রেখে ছড়া লিখে দিয়ে ছিলেন।
এরপর তাঁর সাহিত্যচর্চায় যেন জোয়ার আসে—সাহিত্যের নামে তিনি তখন বস্তুত পাগল। শিশুতোষ, বয়স্কজনতোষ উভয়বিধ গল্পে প্রবন্ধে তার কৃতির পরিমান দাড়ায় প্রায় ঈর্ষনীয়। কিন্তু কেবল পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রচনার হিসেবের খাতায়। তাদের গ্রন্থিত রূপ কাঙ্ক্ষিত ছিলো অবশ্যই। কিন্তু নজরুল ইসলাম, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখ কয়েকজনের কথা বাদ দিলে, মুসলিম লেখকদের জন্য তখন প্রকাশক মেলা ভার। যেমন বয়স্কজনবোধ সাহিত্যের ক্ষেত্রে তেমনি শিশুতোষ সাহিত্যের ক্ষেত্রেও। ততো দিনে সাহিত্যকার রূপে প্রতিষ্ঠিত এবং সুপরিচিত, অন্তত তাঁর সম্প্রদায়ের পাঠকমহলে,—মোহাম্মদ নাসির আলীকে গ্রন্থকার হওয়ার জন্য তাই দিনের পর দিন কেবল অপেক্ষায় হয়।
তাঁর এই অপেক্ষার অবসান ঘটে, ভারতবিভাগের পর "আমাদের কায়েদে আজম" এক গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে। এখানে অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন, গ্রন্থকার হয়েছিলেন তিনি এর আগেও একবার, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকেই। কিন্তু সে সময়ে প্রকাশিত গ্রন্থখানি সাহিত্যগ্রন্থ ছিলো না, ছিলো প্রথম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য লিখিত। প্রকৃত প্রস্তাবে সাহিত্যকার মোহাম্মদ নাসির আলী গ্রন্থকার হন ওই "আমাদের কায়েদে আজম"-এর মাধ্যমে।
গ্রন্থখানি ছিলো শিশুবোধের প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে, ১৯৪৮ সালে, যদিও ততো দিনে ভারত ভাগ হয়ে গেছে, তার ফলে বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানী মোহাম্মদ নাসির আলীর সম্প্রদায়ের লেখকদের হাতছাড়া। অবশ্য তখন ঢাকা থেকে কিছু প্রকাশের তেমন অবকাশও ছিলো না। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণে সে-সময়ে এখানে সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক জগতে দেখা দিয়েছে এক ধরনের স্তব্ধতা, প্রকাশনার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। গ্রন্থখানির প্রসঙ্গে আর একটি বলবার মতো কথা, ভারত বিভাগের আগে যিনি পরিচিত ছিলেন প্রায় সর্বাংশেই বয়স্কজনের লেখক হিসেবে। এই গ্রন্থ তাঁকে যেন আকস্মিকভাবে করে তোলে শিশুজনের লেখক। কথাটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের "কায়েদে আজম" এর অনুজ দুখানি গ্রন্থের কারণে। সেগুলি আত্মপ্রকাশ করে এ-গ্রন্থের আত্মপ্রকাশের পরের বছর এবং দুখানিই ছিলো শিশুতোষ। মোহাম্মদ নাসির আলী বয়স্কজনের জন্য তখনও লিখেছেন সব মিলিয়ে তাঁর বয়স্কজনপাঠ্য রচনার পরিমান—আঙ্গিক আর বিষয়গত বৈচিত্রাও—কম নয়। কিন্তু কেন জানিনা সেগুলির গ্রন্থনের দিকে তিনি মনোযোগ দেননি, মাত্র একটি ক্ষেত্র বাদে। প্রকাশ করেছেন কেবল শিশুপাঠ্য গ্রন্থ একের পর এক। আর সেসব গ্রন্থ নানা শ্রেণীর তবে কি তিনি তাঁর বয়স্কজনপাঠ্য রচনাগুলির প্রতি মমতাবান বা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না কিংবা ভারত বিভাগের পর সাহিত্য ওপর আস্তা হারিয়ে ফেলেন ?
তাঁর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিশুতোষ গ্রন্থও প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। তারপর ঢাকার আত্মপ্রকাশ করে তাঁর অন্তত তিরিশখানি গ্রন্থ। এগুলির মধ্যে, আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি মাত্র একখানি বয়স্কজনের (সে-গ্রন্থ, "ইবনে বতুতার সফরনামা", এক ইংরেজি-গ্রন্থের ফরমায়েশী অনুবাদ এবং তার একটি অংশের কাজ বন্ধু নাসির আলী অনুরোধে করে দিয়েছিলেন কবি মহীউদ্দীন।) বিভাগোত্তর কালে প্রকাশিত তাঁর এই শিশুতোষ গ্রন্থগুলির মধ্যে আমরা মৌলিক রচনা যেমন পাই, তেমনি পাই বিদেশী কাহিনী তথা গ্রন্থের পুনবর্ণনা আর অনুবাদ। আঙ্গিকগত বৈচিত্র্যও কিছু কম নয় উক্ত গ্রন্থগুলির ভেতর আছে গল্প, উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধ। বিচ্ছিন্নতাবে টুকরো খানেক ছন্দিত রচনাও মেলে।
এবার তাঁর শিশুতোষ রচনাকর্মের কিছু বাস্তব পরিচয়। তাঁর প্রথম প্রকাশিত শিশুতোষ রচনা ছিলো গল্প, একথা আগেই বলেছি—এখানে গল্পের কথা দিয়েই তাই আলোচনা শুধু করি।
মোহাম্মদ নাসির আলীর গল্পের সংখ্যা প্রচুর এগুলির অধিকাংশই গ্রন্থিত এবং গ্রন্থের বাইরে অন্তত আঠারোটি গল্প বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁর গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত এই সব গল্পকে মোটামুটি হিসেবে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা চলে। প্রথম ভাগের গল্পগুলি সম্পূর্ণতই মৌলিক অর্থাৎ এগুলির বিষয়, কাহিনী, রচনাকর্ম ইত্যাদির সবই তাঁর নিজস্ব। দ্বিতীয় গোত্রের গল্পগুলির প্লট বা মূল কাহিনী মোহাম্মদ নাসির আলী নিয়েছিলেন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন উৎস থেকে। এ-গোত্রের কিছু গল্পের বিষয় ইতিহাস বা অন্যবিধ উৎস থেকে গৃহীত।
তাঁর সর্বতোভাবে মৌলিক গল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংকলন "লেবুমামার সপ্তকাণ্ড"। এখানি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থও বটে। "লেবুমামার সপ্তকাণ্ড" ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান লেখক সঙ্ঘের মাধ্যমে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক পুরস্কার লাভ করে। এ-গ্রন্থ সাতটি গল্পের সংকলন গ্রন্থনাম থেকেই স্পষ্ট, সব কটি গল্পেরই নায়ক এক এবং তাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন পটভূমিতে বর্ণিত হয়েছে এক একটি চমকপ্রদ হাস্যরসের কাহিনী,—সহজ গতিময় আর নাটকীয় ঘটনাবলীর গ্রন্থনে আর রসময় স্নিগ্ধ ভাষার মাধ্যমে। সর্বত্রই কাহিনীর হাস্যরসের যোগানদার চালিয়াৎ লেবুমামা। আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যে এ-ধরনের একনায়ক কেন্দ্রিক গল্পমালার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ মেলে পশ্চিম বাংলায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা বিষয়ক গ্রন্থগুলিতে আর বর্তমান বাংলাদেশে রাহাত খানের 'দিলুর গল্প'-এ।
"লেমামার সপ্তকাণ্ড"-এর রচনাশৈলীর আভাস দেওয়ার জন্য এর প্রথম গল্প 'বাজিমাত'-এর প্রথম দিকের একটি অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি :
মেজো মামা তখন কলকাতার কোন এক কলেজে বি.এ. পড়েন। দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে তিনিও এসে গেছেন এ উপলক্ষে। তারই মুখে প্রথম শুনলাম লেবুর কথা। তিনি একদিন আমাদের বললেন, লেবু আসবে বিয়েতে। আমি প্রথমে ভাবলাম, বুঝিবা কমলালেবুর কথা বলছেন তিনি। আমাদের মত ছেলেমেয়ে যারা বিয়েতে এসেছে তাদের সবাইকে কমলালেবু খাওয়ানো হবে। কিন্তু শীতকাল ছাড়া কমলালেবু পাবে কোথায় ? তাহলে নিশ্চয়ই বাতাবী লেবু। কিন্তু বাতাবী লেবু হলে আমার তাতে লোভ নেই। একরত্তিও ছ্যাঃ। মামাবাড়ী বিয়েতে এসে কেউ বুঝি বাতাবী লেবু খায়। আমাদের বাড়ীতেই রয়েছে কতো পাকা বাতাবী লেবু। তবে হ্যাঁ, এ অ-দিনের কমলালেবু এনে খাওয়াতে পারলে, আমি দুটা দরকার হলে বেশীও খেতে পারি। শুনেছি কলকাতা এক আজব জায়গা। হয়তো সেখান থেকে কমলালেবুই আসবে।...
'বাজিমাৎ' এবং অন্য দুই-একটি গল্পের পাঠ দেখে মনে হয়, মোহাম্মদ নাসির আলী "লেবুমামার সপ্তকাণ্ড"-র গল্পমালা লিখতে শুরু করেছিলেন বিভাগপূর্ব কালে, কলকাতায় থাকার সময়।
ইতিহাস থেকে আহরণকৃত উপাদান তাঁর অন্তত দুখানি গ্রন্থের উপজীব্য। উপাদানের এই উৎস অবশ্য কেবল ইসলামের ইতিহাস। এবং উপাদানগুলির সবই মোহাম্মদ নাসির আলী ব্যবহার করেন শিক্ষামূলক রচনার জন্য। সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ দুখানির নাম "মণি-কণিকা" আর "শাহী দিনের কাহিনী"। এদের বিশেষ করে "মণি-বাণিকা"-র সব রচনাই আকারে ছোট।
আগেই বলেছি, "মণি-কণিকা"-র রচনাগুলি প্রথমে মাসিক "শিশু-সওগাত"-এ প্রকাশিত হয় এবং তখন এগুলির নাম ছিলো "মণিকণা"। প্রকাশের সূচনা ১৩৪৮ সালের পৌষ মাসে। ইসলামের ইতিহাস থেকে সংগৃহীত তথ্যাদি নিয়ে লিখিত ছোট ছোট বেশ কিছু শিক্ষামূলক রচনার একখানি সংকলন (সম্ভবত) উনিশশো তিরিশের দশকেও প্রকাশিত হয়। লিখেছিলেন অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ এবং মোহাম্মদ আহসানউল্লাহ গ্রন্থখানির নাম "হীরক হার"। তারও লক্ষ্য, "মণি-কণিকা"-র মতো প্রধানত মুসলিম শিশুজন এবং লক্ষ্য আর উপাদানের উৎস যেহেতু অভিন্ন, গ্রন্থ দু'খানির মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। "হীরক হার"-এর রচনাগুলি আসলে anecdote বা সংক্ষিপ্ত উপাখ্যান জাতীয়। আর, "মণি-কণিকা"-র সব রচনাই ওই জাতীয় গল্প। "হীরক হার" এক সময় ছিলো অতি জনপ্রিয় গ্রন্থ। ১৯৪৫ সালের মধ্যেই তার পাঁচটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। "মণিকণা" রচনার মূলে "হীরক হার"—এর কোনো প্রভাব ছিলো কিনা, আমরা জানিনা। কিন্তু দেখা যায় "মণিকনা"-র গ্রন্থরূপ "মণি-কণিকা" তেমনি জনপ্রিয় হয়, এর রচনাগুলি উপভোগ্য ।
গ্রন্থখানির প্রথম গল্পটির সবটুকুই এখানে তুলে দিচ্ছি, ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে :
সুলতান মানজাবের রাজত্বকালে আবুল ফতেহ খাজমি নামে একজন জ্ঞানী লোক ছিলেন। সুলতান তাঁহাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করিতেন। বৃদ্ধ বয়সে এই জ্ঞানী ব্যক্তি নির্জনে বাস করিতে আরম্ভ করেন। সুলতান মনে করিলেন, হয়ত আবুল ফতেহ কোন প্রকার অর্থকষ্টে দিন কাটাইতেছেন। ইহা মনে করিয়া সুলতান তাহাকে প্রচুর অর্থ পাঠাইয়া দিলেন।
আবুল ফতেহ সুলতানের প্রেরিত সমুদয় অর্থ ফেরৎ পাঠাইলেন, এবং বলিলেনঃ আমার বার্ষিক খরচ মোটেই পাঁচ টাকা। প্রত্যহ ভোরে আমার সামান্য দুখানি রুটির দরকার হয়। তাহাতেই আমার সারাদিন চলিয়া যায়। ইহা ছাড়া সপ্তাহে একদিন আমার সামান্য কয়েক টুকরো মাংসের প্রয়োজন হয়। আমার আর বেশি কিছু দরকার হয় না। বর্তমানে আমার নিকট পনর টাকা আছে। ইহাতে আমার তিন বৎসরের অধিক কাল চলিবে। তিন বৎসরের পরেও যদি আমি জীবিত থাকি তবে যে আল্লাহ আমাকে এতদিন আহার যোগাইয়াছেন তিনিই তখন যোগাইবেন। ...
মোহাম্মদ নাসির আলী দেশী-বিদেশী লোকসাহিত্য থেকে কাহিনী সংগ্রহ করেছেন প্রায় দু'হাতে এবং সেগুলি তাঁর পাঠকদের হাতে তুলে দেন নিজের কৌশলে নিজের ভাষায়। কাহিনীগুলি নানা শ্রেণীর কোনোটি রূপকথা, কোনোটি শিক্ষামূলক, কোনোটিবা মধুর হাস্যরসের। তাদের মূল ভূমি দূরবিস্তৃত, যার মুখ্য ভাগ জুড়ে আছে মধ্য আর পশ্চিম এশিয়া, উত্তর ভারত এবং বাংলাদেশ। অন্তত একটি কাহিনী আসলে রূপকথা তিনি নিয়েছেন চীন থেকে। পশ্চিম এশিয়ায় তিনি কাহিনীর জন্য সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি দেন আরব্য উপন্যাসের দিকে। তার থেকে মালমশলা নিয়ে লিখিত রচনার গ্রন্থ প্রকাশিত হয় দু'খানি এবং তার একটি কাহিনী—"আলী বাবার"—তিনি পরিবেশন করেন দু'বার। প্রথমে উপন্যাসের আঙ্গিকে তারপর গল্পের আকারে। শেষোক্ত আকারে কাহিনীটি আরব্য উপন্যাসের অন্য পাঁচটি বিখ্যাত গল্পসহ "আলীফ লায়লার গল্প" নামে গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ করে। অন্য গল্পগুলি—'শাহেরজাদীর কথা', 'সিন্দবাদ ও হিন্দবাদ', 'আবু হোসেন', 'আলাউদ্দীনের প্রদীপ আর 'জেলে ও দৈত্য।
লেখকের গল্পকৃতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশী-বিদেশী লোকসাহিত্যের কাহিনীর বুনিয়াদে পরিবেশিত গল্পগুলি এবং এগুলি প্রকাশিত হয়েছে প্রধানত দশখানি গ্রন্থে। কিছু রচনা ছড়িয়ে আছে অন্যান্য গ্রন্থে এবং পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠায়। এতো বিদেশী কাহিনী আমাদের আর কোনো শিশুসাহিত্যকার পরিবেশন করেননি। প্রধান দশখানি গ্রন্থের মধ্যে আমরা পাই, "আলী বাবার" কাহিনীর উপন্যাস রূপ আর "আলীফ-লায়লার গল্প" ছাড়াও, "বীরবলের খোশগল্প", "সাত পাঁচ গল্প", "চীনদেশের রাজকুমারী", "ভিনদেশী এক বীরবল", "ভিনদেশী গল্প", "সোনার চরকা", "গদাধরের উইল" ইত্যাদি। সংকলিত গ্রন্থগুলির মধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘চতুর চাষী', ‘অলক্ষুণে জুতো', 'সোনার চরকা', 'লোভের খেসারত ‘বখরা নিয়ে ফ্যাসাদ', ‘উজিরের বুদ্ধি' ইত্যাদি। দ্বিতীয় গল্পটি লেখকের গ্রন্থ এবং বিভিন্ন সংকলনের মাধ্যমে এখন পাঠকমহলে সুপরিচিত।
একটু আগেই বলছিলাম, মোহাম্মদ নাসির আলী "আলী বাবার" কাহিনীকে উপন্যাসে রূপ দেন। উপন্যাসের আঙ্গিকে তিনি পরিবেশন করেছেন চীনা রূপকথাটিও। এর মূল কাহিনি ছোট গ্রন্থে বড় বড় অক্ষরে মুদ্রিত এবং প্রচুর ছবিসহ পরিবেশিত হওয়া সত্ত্বেও পৃষ্ঠা জুড়ে আছে মাত্র সতেরোটি। "চীনদেশের রাজকুমারী"-র ভাষা সহজ, সাত আট বছরের ছেলেমেয়েদের উপযোগী।
"বই" পত্রিকার ১৯৬৫ সালের আগস্ট সংখ্যায় এর সমালোচনা লিখতে গিয়ে সরদার ফজলুল করিম বলেন,— এ গ্রন্থ "তার ঝরঝরে ভাষার গৃহে, কাহিনীর সরসতা এবং অগ্রগতিতে আমাদের সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখবে। এর রচনাশৈলীর নমুনা, গ্রন্থের মাঝামাঝি একটি জায়গা থেকে :
একবার ছোট্ট এক শহরে মেলা দেখাতে দিয়ে ঘটলো একটা মজার কান্ড।
তখন বসন্ত কাল। ভোর বেলা রোদ ঝলমল করছে। গাছে গাছে ফুল ফুটেছে। পিচ ফলের গাছ সব ছেয়ে গেছে ফুলে। মৌমাছিরা গুণ গুণ করে গান গাইছে আর মধু সংগ্রহ করছে ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে। ঠিক এমনি এক ভোর বেলা হিলো অন্য লুসান এল জাদু দেখাতে সেই শহরে।
রাস্তায় জায়গা করে তারা জাদু দেখাতে লাগল। সব খেলা দেখানোর পরে শুরু হল লুসানের দড়ির ওপর হাঁটার পালা। শুধু হাঁটার নয়, এখন দড়ির উপর নাচতেও পারে সে। লুসান তার ছাতা হাতে উঠল গিয়ে দড়ির উপর। অনেকক্ষণ দড়ির ওপর হেঁটে সে নাচতে শুরু করল।
ঠিক এমনি সময়ে রাস্তায় উঠল ভয়ানক হৈ চৈ। লুসান উপর থেকে চেয়ে দেখল, যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। ব্যাপার কি, কোথাও আগুন লেগেছে কি ? না, আগুন নয়, রাজার মেয়ে দারলিনের পালকী বেরিয়েছে রাস্তায়। তাই সবাই প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে। জাদুগীর হিলোও তাদের সঙ্গে ছুটে চলেছে।। ...
আর এক উপন্যাস "বোকা বকাই"-এর কাহিনীও লোকসাহিত্য থেকে সংগৃহীত। তবে, এই উপন্যাস মোহাম্মদ নাসির আলীর একক রচনা প্রয়াসের ফল নয়। আগেই বলেছি, রচক এবং গ্রন্থকার হিসেবে তাঁর সাথে আছেন আমাদের আর এক বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যকার আহসান হাবীব। যুগ্ম প্রয়াসে লিখিত গ্রন্থের গুণাগুণ একজন লেখকের সাথে সম্পৃক্ত করা সম্ভব নয়। রচনা প্রয়াসে দুজনেরই যে সাধ্যানুযায়ী অবদান ছিলো, তা অবশ্য সহজেই অনুমেয়। গ্রন্থখানি কেবল শিশুদেরই নয়, বয়স্ক পাঠকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। হুমায়ূন আজাদ ডিসেম্বর, ১৯৬৬-র 'বই পত্রিকায় এর একটি দীর্ঘ আলোচনা লেখেন।
লেখক সংগ্রাহকের ভূমিকাই কেবল পালন করেননি, নিজের মতো করে গল্পটিকে গড়ে নিয়েছেন। এই কাহিনী আমাদের ঐতিহ্যগত কথা-উপধর্মী রূপকথার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সে লোকমুখে প্রচলিত থাকে, শ্রোতার উদ্দেশ্যে বক্তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। মোহাম্মদ নাসির আলী এই বৈশিষ্ট্য রক্ষা করেছেন ।
রূপকথা-উপকথাধর্মী কাহিনীর নায়ক, সে যতখানি অকেজো বা বোকাই হোক না কেন, পরিশেষে প্রতিষ্ঠা তার অবধারিত। অধিকাংশ সময়ই তার হাতে এসে জোটে রাজ্যের বহু ঈঙ্গিত স্বর্ণ সিংহাসনটি, এখানেও তাই। সবদিক থেকে বোকা একাই একটি উপকথা, সমসাময়িক রুচি অনুযায়ী পুনর্গঠিত। অপর একটি বিষয় এ জাতীয় কাহিনীতে লক্ষণীয়। নায়কের বোকামি যতোই হাসির উদ্রেক করুক না কেন, সে কখনো হাস্যাস্পদ হয় না, বরং শিশুমনের ভালোবাসায় রামধনু হয়ে ওঠে। এদিকে লেখকের সচেতনতা প্রশংসনীয়।
সারা বইয়ে এমন শব্দ চোখে পড়ে না, যা শিশুর রসগ্রহণে বাধার কারণ হতে পারে।
কাহিনীটি হাসির, হাস্যরস সৃষ্টিতে লেখক সহজেই সফলতা লাভ করেছেন। তবে হাসির উদ্রেকের জন্য কোন প্রকার কৃত্রিম পদ্ধতি প্রয়োগের প্রবণতা নেই। শিশুদের এই অনাবিল হাসি উপহার দেখার জন্য মোহাম্মদ নাসির আলী অনেক দিন শিশুদের হাসির দেবতা হয়ে থাকবেন।...
গল্প-উপন্যাসের পর মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুতোষ সাহিত্যকৃতির দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ আর সংক্ষেপিত পুনবর্ণনা।
তাঁর বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ, ভাবানুবাদ ইত্যাদি কৃতির সূচনা ঘটে ১৯৪৮ সালে, যখন তিনি পার্ল বাকের একটি গল্পের ভাবানুবাদ করেন। গল্পটির মূল নাম তিনি আমাদের জানাননি। ভাবানুবাদে এটি নাম পায় 'বুড়ী মা' এবং আত্মপ্রকাশ করে "মাসিক মোহাম্মদী"-র কার্তিক, ১৩৫৩ সংখ্যায়। এরপর তিনি আর কোনো গল্পের অনুবাদ বা ভাবানুবাদ কর্মে হাত দিয়েছিলেন কিনা, আমরা জানি না। কিন্তু পাকিস্তান আমলে, উনিশশো পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে এবং ষাটের দশকে, তিনি এক্ষেত্রে হয়ে ওঠেন রীতিমতো তৎপর। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম অনুবাদগ্রন্থ "আকাশ যারা করলো জয়" তারপর অনুবাদ, ভাবানুবাদ আর সংক্ষিপ্ত পুনবর্ণনার গ্রন্থ আমরা পাই ছয়খানি। সর্বশেষ অনুবাদগ্রন্থ "গালিভারস ট্রাভেলস" তাঁর মরণোত্তর প্রকাশনা। এ-গ্রন্থের অনুবাদ মোহাম্মদ নাসির আলী শেষ করে যেতে পারেনি,—তিনি অনুবাদ করেছিলেন কেবল প্রথম গল্পটি এবং দ্বিতীয় গল্পের কিছু অংশ। বাকি অনুবাদ সৈয়দ আবদুল হালিমের।
মোহাম্মদ নাসির আলীর প্রথম শিশুতোষ অনুবাদগ্রন্থ "আকাশ যারা করলো জয়"-এর মূল নাম 'দ্য রাইট ব্রাদার্স', মূল লেখক বুয়েন্টিন রেনল্ডস। বিশটি অধ্যায়ে বিভক্ত এ-গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম অংশ থেকে অনুবাদের নমুনা :
উইল আর অরভ মাকে কাগজ পেনসিল এনে দিল। মা উঠে গিয়ে টেবিলের পর থেকে নিয়ে এলেন একটা রুলার। তারপর দিয়ে বসলেন রান্নাঘরের টেবিলে। বললেন: প্রথমে আঁকতে হবে স্লেডের একটা নকশা।
'স্লেডের নকশা কি হবে মা ? আরভাইল জিজ্ঞেস করে।
"কি করছি এখন চেয়ে চেয়ে দেখো অরভাইল' বলেই তিনি এক হাতে রুলার আরেক হাতে পেনসিল নিলেন।
অরতাইল বললো : আমরা চাই এড সাইনসের মতো স্লেড।
মা জিজ্ঞেস করলেন : এড সাইনাসের স্লেডে ক'টি ছেলেমেয়ে বসতে পারে ?
'দুজন' উইলবার বললো ।...
এ-গ্রন্থের অনুবাদ ছিলো ফরমায়েশী, যেমন ইতালীর জনক এবং ক্ষেত্রেই অনুবাদ নিষ্ঠাতারে মূলানুগ। মোহাম্মদ নাসির আলী 'গালিভার ট্রাভেলস-এ কিছু কিছুটা স্বাধীনতা নেন।
তাঁর সংক্ষিপ্ত পুনবর্ণনার গ্রন্থ মুখানি, "ট্রেজার আইল্যান্ড" এবং "রাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ"। শেষোক্ত পুনর্বণনাটি গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশের আগে শিশুমাসিক "আলাপনী"-তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুসাহিত্য কৃতির প্রসঙ্গে সবশেষে উল্লেখ্য প্রবন্ধজাতীয় রচনার কথা। তাঁর এই জাতীয় রচনাগুলির গ্রন্থিত অংশে আমরা পাই চারটি জীবনী, জনপ্রিয় বিজ্ঞানের একখানি গ্রন্থ এবং সত্যি ঘটনার বিবরণমূলক রচনার তিনটি সংকলন। লেখকের প্রবন্ধজাতীয় রচনার বিষয় অবশ্য বহুবিচিত্র। এক সময় আমি তাঁর অগ্রন্থিত শিশুবোধ প্রবন্ধের একটি তালিকা তৈরি করি। তাতে প্রবন্ধ ছিলো পঁচিশটি। এগুলির একটি বড় অংশ জীবভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবনের ঘটনার বর্ণনা আর চরিত্র বৈশিষ্ট্যের কথা অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে পাই লোককৃতি, সভ্যতা, বিজ্ঞান, প্রত্নকথা, নীতিকথা, স্মৃতিচারণ ইত্যাদি। অর্থাৎ তাঁর শিশুতোষ প্রবন্ধকৃতি বহুমুখী চিন্তার ফল।
মোহাম্মদ নাসির আলীর জীবনীগ্রন্থগুলির প্রথম খানির নাম আমি আগেই বলেছি। অন্যগুলির নাম "ছোটদের ওমর ফারুক" "মোহাম্মদ-বিন কাসেম" এবং "বাদশা আলমগীর"। এমনিতে তিনি জীবনী রচনা করেছেন সংশ্লিষ্ট মহাপুরুষের জীবনের ঘটনাবলীর অনুপুর্বিক বিবরণ দিয়ে। কিন্তু "ছোটদের ওমর ফারুক"-এ এর কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটে। মোট এগারটি অধ্যায়ের সমষ্টি, এ-গ্রন্থে তিনি হজরত ওমরের জীবনকথা বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চরিত্র বৈশিষ্ট্য জ্ঞাপক কিছু ঘটনা গল্পের আকারে বলে গেছেন।
জীবনী রচনার এই কৌশলটি আমরা প্রথম দেখি মোহাম্মদ নাসির আলীর প্রথম জীবনের এক সাহিত্যিক সতীর্থ তোরাব আলীর রচনায়। জীবনী রচনায় মোহাম্মদ নাসির আলী প্রথম দিকে ব্যবহার করতেন সাধু ভাষা। পরে চলে আসেন চলিত ভাষায়। শিশুরঞ্জনের প্রয়াস অবশ্য দুটি ক্ষেত্রেই সমানভাবে সার্থক। বিচারকের আসনা শীর্ষক একটি অধ্যায় থেকে "ছোটদের ওমর ফারুক" এর রচনাশৈলীর নমুনা :
খলিফার চোখে আমীর ফকিরে কোন ভেদাভেদ ছিল না। বড়-ছোট, ধনী-গরীব, সকল মানুষকেই তিনি সমান চোখে দেখিতেন। অপরাধী ধনী হউক, গরীব হউক, অপরাধীর বিচার একই আইনে হইত।
একবার হযরত ওমর (রা) হজ করিতে গিয়াছিলেন। সেবার একটি ছোট রাজ্যের নবাবও হজে গিয়াছিলেন। হজের সময় তিনি যখন অপর সকলের সঙ্গে কাবা ঘরের চারিদিক ঘুরিতেছেন, তখন তাঁহার চাদরের একটি কোণ মাটিতে পড়িয়া গেল। তাঁহার পিছনেই একজন গরীব মুসলমান ছিল। বেচারা না দেখিয়া চাদরে পা দিয়া ফেলিল। ইহাতে চাদরখানা নবাবের কাঁধ হইতে পড়িয়া গেল। নবাব রাগিয়া উঠিলেন এবং লোকটির মুখে হঠাৎ একটি ঘুখি বসাইয়া দিলেন ।....
এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, মোহাম্মদ নাসির আলী বাস্তব ঘটনা নিয়ে যেসব প্রবন্ধ রচনা করেন, সেগুলিরও একটি বড় অংশ গল্পের মতো ভাষায় লিখিত। তাঁর এই শ্রেণীর রচনাগুলি সংকলিত হয়েছে "তিমির পেটে কয়েক ঘন্টা", "বারোশো বানরের পাল্লায়" আর "মৃত্যুর সাথে পাঞ্জ"-তে। সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলির রচনা যখনকারই হোক না কেন, গ্রন্থগুলি আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর মৃত্যুর পরে, ১৯৭৬ সালে। সর্বাধিক নন্দিত "তিমির পেটে কয়েক ঘন্টা"। গ্রন্থখানির বারোটি রচনার প্রায় সব কটিরই উপজীব্য রোমাঞ্চকর বাস্তব ঘটনা। এর 'দাঁড় টেনে আন্দামান' শীর্ষক রচনাটি ১৯৬৬ সালের একটি ঘটনা নিয়ে লিখিত। তার একাংশ, মূল ঘটনার কিছু প্রাসঙ্গিক কথা :
অনেক কাল আগে মার্কিন মুলুকের অধিবাসী অ্যালফ্রেড জনসন দেশের স্বাধীনতা শতবার্ষিকী উৎসবকে স্মরণীয় করবার জন্যে 'সেন্টনিয়াল' নামক একখানা ষোল ফিট লম্বা নৌকোয় সমুদ্রযাত্রা করেন একাকী। চার বন্ধুর সঙ্গে দল বেঁধে নরওয়ের মিঃ থর হেয়ারডাল 'কনটিকি' নামক এক ভেলায় চড়ে সাগর পাড়ি দেন প্রশান্ত মহাসাগরের স্রোতের গতি প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্যে। তা ছাড়া স্যার ফ্রানসিস ড্রেক, ক্রিসটোফার কলম্বাস, ভাসকো ডা গামা প্রভৃতি অনেক অভিযাত্রীর নৌ-অভিযানের নজির তোমরা পাবে পুঁথি-পুস্তকে। তাঁরা সবাই সমুদ্র পরিক্রমায় বেরিয়েছেন পাল-নির্ভর নৌকো বা জাহাজে। সে হিসেবে সাম্প্রতিক কালে রোজার ও বিথের মত এ ধরনের বীরত্বপূর্ণ অভিযান সত্যিই নজিরবিহীন।....
মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুতোষ প্রবন্ধকৃতিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য "যোগাযোগ"। এ-গ্রন্থে কেবল তাঁর রচনাবলীতেই নয়, আমাদের সময় শিশুসাহিত্যেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতি। "যোগাযোগ"-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক বিষয়ের নতুনত্ব। সভ্যতার অগ্রগতিতে যেসব জিনিসের গুরুত্ব সর্বাধিক, যোগাযোগ তথা পরিবহন ব্যবস্থা তাদের অন্যতম। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের শিশুসাহিত্যে "যোগাযোগ"-এর আগে কোনো পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দেখা যায়নি, পরিবহনের দুই-একটি মাধ্যমের ছোট ছোট আলোচনা পাওয়া গেছে যদিও। মোহাম্মদ নাসির আলী চেয়েছিলেন প্রয়োজনীয় তথ্যের বুনিয়াদে গোটা বিষয়টিকে শিক্ষামূলক করে ছোটদের সামনে তুলে ধরতে। পরিবেশনের গুণে এতে আনন্দের উপকরণও কিছু কম আসেনি। সব মিলিয়ে গ্রন্থখানি কেবল ছোটদের জন্যই নয়, বড়দের কাছেও হয়ে উঠেছে উপভোগ্য। মোহাম্মদ নাসির আলীর এই সাফল্যের মূলে আছে তাঁর জ্ঞানসন্ধানী অধ্যয়ন এবং গোটা সাহিত্যিক জীবনে ভাষার অনুশীলনে লব্ধ অভিজ্ঞতার বুনিয়াদে রচনাগত উৎকর্ষ। "যোগাযোগ" প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে এবং সেই বছরই লেখকের জন্য জয় করে আনে এক আন্তর্জাতিক সম্মান,—'ইউনেস্কো পুরস্কার'। পরবর্তী কালে এ-গ্রন্থ চেক ভাষায় অনূদিত হয়।
প্রায় গল্পসূলভ ভাষায় পরিবেশিত "যোগাযোগ"-এর রচনাশৈলীর আভাস, তার প্রথম অধ্যায়ের সূচনাভাগ থেকে :
তোমরা হয়তো শুনে থাকবে, গুরুজনেরা কেউ কেউ বলেন, পৃথিবীটা আজকাল অনেক ছোট হয়ে গেছে। মানুষের পাল্লায় পড়ে দিন দিন আরো ছোট হচ্ছে। বেঁচে থাকলে আরো কতো কী যে দেখতে হবে !
কথাটা শুনতে অবাক লাগে, নয় কি ? আমরা জানি, দিন দিন সবকিছু বাড়ে, সবকিছু বড় হয়। মানুষ ছোট থেকে বড় হয়, গাছপালা, জীবজন্ত—সবই ছোট থেকে বড় হয়। তাহলে পৃথিবীটাই কি বড় থেকে ছোট হচ্ছে ? তা তো হতে পারে না। মাপজোক দিয়ে দেখার উপায় থাকলে দেখা যেতো, পৃথিবীটা একচুলও কমেনি।
তাহলে আসল ব্যাপারটা কি ?
হ্যাঁ, আসল ব্যাপারটা জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বহু যুগ আগে আদিকালে। তখন এ পৃথিবীটাই ছিল আজব ধরনের। তখনকার পৃথিবীতে না ছিল ভাল রাস্তাঘাট, না ছিল আজকের মতো কোনো রেলগাড়ী বা উড়োজাহাজ। পানিতে চলাচলের জন্যে সে যুগে জাহাজ তো দূরের কথা, নৌকাও ছিল না। জাহাজ, রেলগাড়ী, মোটর গাড়ী,, উড়োজাহাজ, এমন কি, নৌকা ছাড়া সে পৃথিবী, আজকের তুলনায় সে পৃথিবী আজব বই কি।....
মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুসাহিত্যকৃতির হিসাবনিকাশে আরো দুটি জিনিসের উল্লেখ না করলে উক্ত কৃতির পরিচিতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই দুটির একটি নাটক, অন্যটি ছন্দিত রচনা। এগুলি মিলিয়ে তাঁর সমগ্র শিশুসাহিত্যকৃতির হিসাব নিলে আমরা দেখতে পাবো, শিশুরঞ্জনের জন্য তিনি সাহিত্যের কোনো শাখাই অস্পষ্ট রাখেননি।
উপরিউক্ত দুটি ক্ষেত্রে তাঁর রাচনার পরিমাণ অবশ্য সামান্য। বিশেষত নাটকের বেলায়। তার জীবদ্দশায় এ-জাতীয় রচনার কোনো গ্রন্থও প্রকাশিত হয়নি। তবে, ১৯৫৩ সালের ঈদসংখ্যা "দৈনিক মিল্লাত"-এ "বোবারা সব কালা" নামে তাঁর একটি নাটিকা আত্মপ্রকাশ করে। নানা কারণে আমাদের অনুমান, এটি বিভাগপূর্ব কালের রচনা। তাঁর মৃত্যুর প্রায় আট বছর পর, ১৯৮২ সালে, এই রচনাটি এবং 'যৌতুক' নামে আর একটি নাটিকা নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র নাট্যগ্রন্থ "বোবারা সব কালা ও যৌতুক" প্রথম নাটিকাটি সর্বতোভাবেই মৌলিক রচনা এবং একই সঙ্গে সামাজিক আর হাস্যরসজীবী। দ্বিতীয় রচনাটির কাহিনী মোহাম্মদ নাসির আলী নিয়েছিলেন কোনো বিদেশী লোকসাহিত্য থেকে। এটিতেও সামাজিক বক্তব্য আছে এবং সেই সঙ্গে হাস্যরসও ।
ছন্দিত রচনায় তিনি হাত দিয়েছিলেন সাহিত্যিক জীবনের একেবারে প্রথম দিকেই। এবং তার কিছু দিন পর, যে-বছর তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত হয়, সেই ১৯২২ সালেই, মাসিক "শিশুসাথী"-তে দেখা যায় 'দেশ-বিদেশের খাবার' নামে তাঁর একটি পদ্যজাতীয় রচনা। যতো দূর জানি, পরিণত বয়সে তিনি কবিতার চর্চা করেননি।
কিন্তু 'ভিনদেশী এক বীরবল'-এর উৎসর্গপত্রে একটি ছোট্ট ছন্দিত রচনা আছে। এই মিষ্টি সুরেলা রচনাটিই এখন আমাদের হাতে মোহাম্মদ নাসির আলীর ছন্দিত রচনার একমাত্র নিদর্শন :
ভিনদেশী এক গল্পবুড়ো
এলেন এবার বাংলাদেশে
গল্প যদি শুনবে তবে
বরণ করো মিষ্টি হেসে।
আদর করে ভুলিয়ে তাকে
তোমাদের এই আসরে আজ
নিয়ে এলাম পথ দেখিয়ে
সবার আগে এলাম নিয়ে।
সবশেষে মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুতোষ রচনার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে দুই-একটি কথা বলা প্রয়োজন।
এই সাহিত্যকৃতির সাথে পরিচিত যে কোনো নিবিষ্ট এবং সচেতন পাঠকেরই তাঁর প্রথম যে বৈশিষ্ট্যটি চোখে পড়বে, সেটি হল রচনাশৈলীর সরলতা। তার রচনাকর্মে কোথাও কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই, জটিলতাও,—চমক সৃষ্টির প্রয়াস তো দূরের কথা। কাহিনী তথা বক্তব্য তাঁর লেখনীতে এসেছে যেন প্রকৃতির দেওয়া স্বাভাবিক রূপে, কোনো রকম বাকপটু ভনিতা না করে—এবং তা এগিয়েও গেছে নিজস্ব গতিতে, অবলীলায়। আর, এতে সহায়ক তাঁর সহজ সরল, একান্তই আড়ম্বরহীন ভাষা। এর জন্য কেউ কেউ তাকে 'অনাধুনিক' বলে কটূক্তি করেছেন, এই সত্যটি ভুলে গিয়ে যে, কারুকাজ ভরা 'আধুনিক' ভাষার যেমন একটি আকর্ষণ আছে, তেমনি আকর্ষণ আছে সহজ সরল, আড়ম্বরহীন তথাকথিত 'অনাধুনিক' শিশুসাহিত্যের ভাষারও। মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুতোষ রচনাবলীর ব্যাপক জনপ্রিয়তাই সাক্ষী, তার উক্তবিধ ভাষা রচনার রস বা আকর্ষণ উদ্দিষ্ট পাঠকদের কাছে ক্ষুণ্ণ করেনি। এমনকি, যেসব বচনায় কিছু বুদ্ধির দীপ্তি আছে এবং কারুকাজময় আধুনিক ভাষা প্রয়োগের অবকাশ ছিলো, সেগুলিতেও। যেমন আমরা দেখি "লেবুমামার সপ্তকাণ্ড"-এর গল্পগুলিতে।
মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুসাহিত্যকৃতির আর এক বৈশিষ্ট্য তার বিষয়গত বৈচিত্র্য। তাঁর গল্পে এবং প্রবন্ধজাতীয় রচনাগুলিতে যে কতো বিচিত্র ধরনের বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে, তার বুঝি হিসাব নেই। তিনি কখনো পরিবেশন করেছেন হাসির কথা, কখনো চমকপ্রদ ঘটনা, কখনো বা জনপ্রিয় বিজ্ঞান এবং এই সমাবেশের আড়াল থেকে উকি দেয় এক পরিশ্রমী সংগ্রাহকের মুখ, যিনি ছিলেন আজীবন এক নিয়মিত আর নিবিষ্ট পাঠক। জীবন-জীবিকার নানা কর্মের ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ খুঁজে নিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্যের নানা গ্রন্থ আর পত্রপত্রিকায় মুখ গুঁজে থেকেছেন। কেবল তাঁর সাহিত্যপাঠ বা জ্ঞান স্পৃহা নিবারণের জন্য নয়, শিশুরঞ্জক বিষয়াদির সন্ধানেও। এমন পাঠনিষ্ঠা বাংলাদেশের খুব কম শিশুসাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
তার এই পাঠনিষ্ঠার এক ফল, অন্য সব বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে, মোহাম্মদ নাসির আলীর রচনাবলীকে শিশু পাঠকমহলের বাইরেও নিয়ে গেছে। সেখানে তিনি অনেক বয়স্কজনেরও লেখক। তাঁর রচনাবলীতে এমন গ্রন্থ বস্তুত খুব কমই আছে, যেগুলি শিশু এবং বয়স্কজনের যৌথভোগের সামগ্রী নয়। এ-প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ্য তাঁর সেই সব গ্রন্থ, যেগুলিতে একই সঙ্গে আছে আনন্দের উপকরণ আর জ্ঞানের সন্ধান। এ-জাতীয় গ্রন্থগুলির মধ্যে আমরা পাই "যোগাযোগ", "তিমির পেটে কয়েক ঘন্টা", "বারোশো বানরের পাল্লায়" এবং "মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা"। ঐতিহাসিক তথ্য এবং শিক্ষামূলক বিষয়াদির জন্য, তার সাহিত্যিক জীবনের প্রথম দিকের রচনা "মণি-কণিকা" আর "শাহী দিনের কাহিনী"-র গুরুত্বও এক্ষেত্রে কিছু কম নয়,—যদিও গ্ৰন্থ দুখানির সাহিত্যিক উপভোগ্যতা তথা শিশুদের কাছে বোধগম্যতা তাদের অনুজদের তুলনায় অনেকটা ম্লান। মাঝে মাঝে সহজলভ্য প্রচলিত শব্দের পরিবর্তে সাধু ভাষাসুলভ কঠিন শব্দ প্রয়োগের দরুন দুই গ্রন্থেই ভাষাগত প্রসাদগুণের ন্যূনতা ঘটে। পরিমার্জনে এই ন্যূনতা অনায়াসেই দূর করা যেতো।
মোহাম্মদ নাসির আলীর শিশুসাহিত্যকৃতির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, আমার মনে হয়েছে, হাস্যরসঋদ্ধতা। যা ছড়িয়ে আছে তাঁর রচনাবলীর একটি বড় অংশে। হাস্যরসের এমন প্রাধান্য আমরা বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে পাই আর মাত্র একজনের রচনায়, যিনি তাঁর কিছুটা সমকালীন কিন্তু বয়সে অনেক ছোট,—গোলাম রহমান। মোহাম্মদ নাসির আলীর রচনার এই দিকটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমি অন্যত্র যা বলেছি, এখানে তা উদ্ধৃত করলে অন্যায় হবে না.-
হাস্যরসাত্মক গল্পগুলিতে মোহাম্মদ নাসির আলীর রচনাশৈলীর একটি বৈশিষ্ট্য, তাতে হাস্যরস সারা কাহিনীতে মিশে গিয়ে—অন্তর্নিহিত হয়ে—ছড়িয়ে থাকে। মাঝে মাঝে গল্পের অন্তর্গত কোনো ঘটনা বা ঘটনাংশ হাস্যরস সৃষ্টি করে বটে, কিন্তু সংলাপনির্ভর হাস্যরস বড় একটা চোখে পড়ে না। এমনকি লেখকের কোনো হাস্যরসাত্মক মন্তব্যও কোথাও নেই। কেবল "বোবারা সব কালা" নাটিকার প্রথমাংশে ঘটনা এবং কথা দুই-ই হাস্যরসের উৎস। "'লেবু মামার সপ্তকারণ্ড"-এর সব কটি গল্পেই হাস্যরস সমগ্র কাহিনী থেকে উৎসারিত।
মধ্যপ্রাচ্যের লোকসাহিত্য থেকে সংগৃহীত "অলক্ষণে জুতো" নামক গল্পে দেখি, নায়ক অর্থলোভী কৃপণ আলী আৰু তার শত তালি লাগানো পুরোণনা জুতো জোড়া এমনিতে ছাড়তে চায় না। কিন্তু ছাড়তে যায়, ঘটনাচক্রে বার বার বিপদে পড়ে। এই গল্পে, —যেমন মোহাম্মদ নাসির আলীর অন্যান্য হাসির গল্পেও—ঘটনাগুলি নিজেরাই নিজেদের কথা বলে।
মোহাম্মদ নাসির আলীর হাস্যরসাত্মক রচনার এই বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বিনা মন্তব্যে বা কৌতুককর সংলাপের আশ্রয় না নিয়ে হাস্যরস সৃষ্টির প্রয়াস তার সামনে সতীর্থ শিশুসাহিত্যিক মহলে খুব বেশি দেখা যায় না ...
তাঁর হাস্যরসের আর এক বৈশিষ্ট্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা উচ্ছল বা অতি সরব হাসির সৃষ্টি করে না। বরং মৃদু হাসিরই সংযমী পক্ষপাতী। যেখানে হাস্যরস কিছুটা প্রবল, যেমন চালিয়াৎ লেবু মামার কাহিনীগুলিতে, সংশ্লিষ্ট রচনাটি পাঠের পর পাঠক বড় জোর বলে ওঠেন, বাঃ, বেশ মজার ব্যাপার তো। বীরবল এবং নাসিরউদ্দীন হোজ্জার কাহিনীগুলি অবশ্য একটু স্বতন্ত্র গোত্রের। কিন্তু সরব হাসির এই সব কাহিনীমালা মোহাম্মদ নাসির আলীর মৌলিক রচনা নয়, সংগৃহীত লোককাহিনীর পুনবর্ণনা।
প্রসঙ্গত, তাঁর হাস্যরসম্প্রীতি তাঁকে হাস্যরসাত্মক কাহিনীর জন্য বার বার দেশ-বিদেশের লোকসাহিত্যের দিকে টেনে নিয়ে গেছে এবং তিনি সেসবের ভাণ্ডার থেকে প্রচুর কাহিনী তাঁর ঝুলিতে ভরে এনেছেন। সেই ঝুলি থেকেই আমরা পাই "ভিনদেশী এক বীরবল" এবং "বীরবলের খোশগল্প" নামের গ্রন্থগুলি এবং তাঁর বিভিন্ন গল্পগ্রন্থের বেশ কিছু রচনা আর "বোকা বকাই" নামের উপন্যাসখানি। এমন হাস্যরসপ্রিয় যে লেখক, তিনি আমাদের শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান লাভের অধিকারী।
লেখা সংগ্রহ ও সম্পাদনা : সুশোভন ইফতেখার শাওন



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন