নাসিরুদ্দিন ? যে নামেই ডাকো, হাসির ঝরনাধারা / সুশোভন ইফতেখার শাওন

 

ভীনদেশী এক বীরবল
মোহাম্মদ নাসির আলী


একই অঙ্গে এত রূপ’-মান্নাদের বিখ্যাত এ গানের আগে কেউ অমন মনমাতানো সুর শুনেছেন কিনা তা জোর দিয়ে বলতে পারব না। একইভাবে একই ব্যক্তিত্বের অনেক নামের কথাও বোধহয় কমই জানি আমরা। এ রকম এক ব্যক্তিত্ব হলেন আমাদের অনেককালের পরিচিত, হাসি-বন্ধু, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, মোল্লা নাসিরুদ্দিন, নাসিরুদ্দিন খোজা, (দক্ষিণ এশিয়ায়) জুহা, নাসিরুদ্দিন এফেনদি কিংবা শুধু নাসিরুদ্দিন নাম নিলে বোঝানো হয় তাকেই। ‘ভিনদেশী এক বীরবল’ বলেও তাকে আখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী। তার অনূদিত হোজ্জার গল্প-সংকলনটির নামই ‘ভিনদেশী এক বীরবল’। 

গোলাপ যে নামেই ডাকো। তেমনি নাসিরুদ্দিন যে নামেই ডাকো, হাসির ঝরনাধারা, অনাবিল প্রবাহ। ‘মিষ্টি হাসির দুষ্টুমি’ থেকে মশকরা, নির্মল রসিকতা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ এমনকি হো হো হাসি বা অট্টহাসিসহ হাসির সকল ধরনকেই পাওয়া যাবে তাকে নিয়ে গল্পগাঁথায়। এসব গল্পের কোনো কোনোটিতে দার্শনিক দৃষ্টির ছোঁয়াও মিলবে। কিংবা শিক্ষণীয় বিষয়ও থাকতে পারে তার কোনো কোনো গপ্পে। আর যা-ই হোক, সবকিছুকেই ছাপিয়ে থাকবে হাসির তরঙ্গমালা। হোজ্জার গল্পমালা ‘ইরান-তুরান পার হয়ে’ বাংলাদেশেই কেবল আসেনি বরং হাল আমলের পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই হাসির ধ্রুপদি উৎস হয়েই বিরাজ করছে। অবশ্য আদিতে বলকান দেশ থেকে চীন দেশ পর্যন্ত লোককাহিনিতে হোজ্জাকেন্দ্রিক গল্পগুলোর দেখা মিলত।

হোজ্জার নামের সাথে তুরস্কের শহর আকসেহির নাম অবিচ্ছেদ্যভাবেই জড়িয়ে রয়েছে। তিনি ১৩ শতকে জন্মে ছিলেন বলেও নানা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মনে করা হয়। এই বিভিন্ন সূত্র বলেই নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে দার্শনিক, জ্ঞানী, আলেম (ধর্মবেত্তা), হাস্যরসের অধিকারী, সরস, তীক্ষ্ন বুদ্ধিমান ব্যক্তিত্বের কাতারে ফেলা হয়। তাঁর গল্পগুলো বিশ্বের প্রায় সব জায়গায়ই শোনা যাবে। তুর্কিভাষী বিশ্বের উপজাতিদের মধ্যে থেকে পারস্য, আরব, আফ্রিকা এবং রেশম সড়ক বা সিল্ক রোড ধরে চীন এবং ভারত, পরে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্যই, প্রায় সাতশ বছর ধরে এসব গল্প হোজ্জার নামে চলছে। কিন্তু সব গল্পের সাথে হোজ্জার সম্পর্ক হয়তো নেই। শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ গল্প বিশুদ্ধ তুর্কিও নয়। বরং মুসলিম এবং এশীয় সংস্কৃতির অন্যান্য মানুষের সম্মিলিত মশকরা, ঠাট্টা বা হাস্যরস, বোকামি কিংবা আহাম্মকীর অমোঘ ফসল। এ কথা অনেকেরই মনে আছে যে ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দকে ইউনেসকো ‘নাসিরুদ্দিন হোজ্জা বছর’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। হোজ্জা যদি আজও বেঁচে থাকতেন, তবে তার বয়স হতো মাত্র ৮১৫-এর কাছাকাছি! 
বীরবলের জীবন বৃত্তান্ত পাওয়া গেলেও ‘ভিনদেশী এই বীরবলের’ জীবনের কথা সঠিকভাবে আজও জানা সম্ভব হয়নি। তার ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে অনেক কথাই চালাচালি হয়। কিন্তু সন্দেহাতীত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। ইতিহাসের দিকে নজর রাখলে দেখা যাবে, ১৬ শতকের পর থেকে বিভিন্ন উৎস থেকে আসা জনপ্রিয় ঐতিহ্য, উপাখ্যান, কৌতুকগাঁথা, ঠাট্টা-মশকরাগুলোর স্ফটিকরণের সূত্র হয়ে সক্রিয় রয়েছে হোজ্জার নাম।



 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ল্য দোজিয়েম সেক্স/দি সেকেন্ড সেক্স/শি লিঙ্গ

শহীদ জিয়ার জীবন রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ / সুশোভন ইফতেখার শাওন

সময় এসেছে বইমেলা নিয়ে ভাববার