বইমেলার ইতিহাস ও আমার ভাবনা / সুশোভন ইফতেখার শাওন
![]() |
| মেলায় প্রথম দিকের বই প্রদর্শনী |
‘বইমেলা’ কিংবা ‘গ্রন্থমেলা’ শব্দ দু’টির যেকোনো একটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘বাংলা একাডেমী’ আয়োজিত একুশে বইমেলা। যে মেলা বইপ্রেমী মানুষের প্রাণে দোলা দেয়। এক অদৃশ্য শক্তিবলে লাখো মানুষকে টেনে আনে একাডেমীর বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে। বর্ধমান হাউস ও এর আশপাশ ঘিরে জমে ওঠে লেখকদের জমজমাট আড্ডা। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের যে বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এই মাসে আয়োজিত এই বইমেলার নামকরণ করা হয় 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।
‘একুশে গ্রন্থমেলা’ মানেই লেখক প্রকাশকদের নির্ঘুম রাত। প্রকাশিত হয় হাজার হাজার বই। নতুন বইয়ের মৌ মৌ গন্ধে মোহিত হয় মেলায় আসা পাঠক, ক্রেতা, দর্শনার্থী। বিক্রি হয় লাখ লাখ কপি বই। এসবই আমাদের কাছে খুব চেনা এবং জানা একটি বিষয়। কিন্তু আমরা অনেকেই এই মেলার ইতিহাস জানি না। আসুন জেনে নেই অমর একুশে গ্রন্থমেলার ইতিহাস।
![]() |
| বইমেলার স্টলে ঘুরে বই দেখছেন কবি সুফিয়া কামাল |
অমর ‘একুশে গ্রন্থমেলা’ আমাদের কাছে ব্যাপকভাবে ‘একুশে বইমেলা’ নামেই পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। যতদূর জানা যায়, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। এই ৩২টি বই ছিলো চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা বই।
এ বিষয়ে আমার দ্বিমত আছে ইতিহাস তাই বলে, *বই মেলার ইতিহাস আরো পুরোনো ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন হয়েছিল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অভিভাষণ দিতে গিয়ে প্রথম ‘একাডেমি’ অর্থাৎ ‘বাংলা একাডেমী’-র কথা উল্লেখ করেন। নানা ঘটনার মিশেলে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ‘বাংলা একাডেমী’ প্রতিষ্ঠা পায়। ‘বাংলা একাডেমী’ চলতে থাকে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের আলোক দিশারূপে। ‘বাংলা একাডেমী’ -র অনেকাংশে অনুরূপ কার্যক্রম নিয়ে পাকিস্তান পর্বে বলবৎ ছিল কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড। বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় পাকিস্তান পর্বের লেখালেখি প্রকাশনা বইমেলা গুরুত্ববহ। যদিও পশ্চিমাদের তির্যক দৃষ্টি এড়িয়ে নিজস্ব সংস্কৃতির নিশান উড্ডয়ন এক দুরূহ বিষয় ছিল। সংস্কৃতিসেবীদের অতল দেশপ্রেম ও নিষ্ঠার ফলে পাকিস্তান পর্বেও আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিজস্ব মাত্রায় এগোতে থাকে। এ ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নবোত্থান আমাদের জন্য সঞ্জীবনী শক্তি এনে দেয়। পাকিস্তান পর্বে সাহিত্যচর্চার একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল প্রকাশনা। বই প্রকাশে ‘বাংলা একাডেমী’-র বাইরে সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল গুটিকয়েক। ‘বাংলা একাডেমী’ যেহেতু প্রাদেশিক (পূর্ব পাকিস্তানের) সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, ফলে সামর্থ্যও ছিল অপ্রতুল। কিন্তু সাহিত্যের চর্চা ও প্রকাশ সমার্থক এই মর্ম উপলব্ধি করে ‘বাংলা একাডেমী’-র কর্মকর্তারা পাকিস্তান পর্বে দেশজ সাহিত্যের সেবায় কর্মকর্তা নয় বরং সংস্কৃতিসেবীর মতো কাজ করেছে। এ প্রসঙ্গে সরদার জয়েন উদদীন, ফজলে রাব্বির নাম প্রাতঃস্মরণীয়। সরদার জয়েন উদদীন প্রথম ১৯৬৪ সালের ১৮-২৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের নিচতলায় বইমেলার আয়োজন করেন। এটাই পূর্ববঙ্গের বইমেলার ইতিহাসের প্রথম পাঠ। পূর্ববঙ্গের প্রথম বইমেলার আলোচনাপর্বে বাঙালির সংস্কৃতির পরিতোষণের প্রভাব লক্ষণীয়। বইমেলা উপলক্ষে গঠিত প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল মুদ্রণ ও প্রকাশন : প্রতিবন্ধক ও প্রতিকার (মুহম্মদ সফিউল্লা) বইয়ের বাজার (মোহাম্মদ নাসির আলী) গ্রন্থাগার সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির উপায় (মোহাম্মদ সিদ্দিক খান) ইত্যাদি। পাকিস্তানপর্বে গুটিকয়েক বইমেলার ক্ষুদ্র আয়োজন হলেও ১৯৬৪ সালে সরদার জয়েন উদদীনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠেয় বইমেলার মতো ছিল না। আমাদের স্বাধীনতার মাধ্যমেই জাতীয় জীবনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক রেনেসাঁসের বীজমন্ত্র জাগরূক হয়। (* চিহ্নিত লেখার তথ্যসূত্র : খান মাহবুব/লেখক, প্রকাশক ও অধ্যাপক) এক্ষেত্রে শুধু এতটুকু বলা যায় প্রয়াত শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা ‘বাংলা একাডেমী’ -র প্রাঙ্গনে প্রথম বই নিয়ে বসেন বইমেলার গোড়াপত্তন করেন কথাটি ভুল।
১৯৭৩ সালে ‘বাংলা একাডেমী’ মহান একুশে মেলা উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে একাডেমী প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। এর পাশাপাশি মুক্তধারা, স্টান্ডার্ড পাবলিশার্স, নওরোজ কিতাবিস্তান এবং এদের দেখাদেখি আরও কেউ কেউ বাংলা একাডেমীর মাঠে নিজেদের বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে।এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমী তার নিজস্ব প্রকাশিত বই প্রদর্শন ও ম্যুরাল প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রফেসর আবু মহাম্মেদ হবীবুল্লাহ। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। ঐ সময় অমর একুশে উপলক্ষে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা অনুষ্ঠিত হতো। মেলার তখন নাম ছিলো একুশে গ্রন্থমেলা। ১৯৮১ সালের একুশে বইমেলার মেয়াদ কমিয়ে ২১ দিনের পরিবর্তে ১৪ দিন করা হয়। কিন্তু প্রকাশকদের দাবির মুখে ১৯৮২ সালে মেলার মেয়াদ পুনরায় বৃদ্ধি করে করা হয় ২১ দিন। মেলার উদ্যোক্তা বাংলা একাডেমী। সহযোগিতায় ছিলো জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। ১৯৮৩ সালে মেলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে বাদ দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সাল থেকে এই মেলা মেলার নতুন নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ঐ গণজমায়েতকে সামনে রেখে ঢাকার বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান একাডেমীর পূর্বদিকের দেয়াল বরাবর নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় যে যার মতো কিছু স্টল নির্মাণ করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। এতে ‘বাংলা একাডেমী’-র কোনো ভূমিকা ছিলো না শুধু মাঠের জায়গাটুকু দেওয়া ছাড়া।১৯৭৫ সালে একাডেমী মাঠের কিছু জায়গা চুনের দাগ দিয়ে প্রকাশকদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়। প্রকাশকরা যে যার মতো স্টল তৈরি করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। এ অবস্থা চলতে থাকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত। এ সময় পর্যন্ত এই আয়োজনের কোনো স্বীকৃতি ছিলো না। কোনো নামও দেওয়া হয়নি। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনেও এর কোনো উল্লেখ থাকতো না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর অনুষ্ঠানসূচিতেও এই কার্যক্রমের কোনো উল্লেখ করা হয়নি।
১৯৭৮ সালে ‘বাংলা একাডেমী’-র তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী ‘বাংলা একাডেমী’-কে মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। প্রকাশকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাড়ানো হয় মেলার পরিসর। সেই ক্ষুদ্র মেলা কালানুক্রমে বাঙালির প্রাণের বইমেলায় পরিণত হয়েছে। পরিণত হয়েছে লেখক প্রকাশক পাঠকদের মহামিলন তীর্থে। এরপর ক্রেতা, দর্শক ও বিক্রেতাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৪ সাল থেকে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এই মেলা নিয়মিতভাবে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
আগেই জেনেছি ১৯৭৩ সালে
বাংলা একাডেমী মহান একুশে মেলা উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাতদিন
অনুষ্ঠিত হতো এবং পরবর্তীতে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের সাত
তারিখ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রন্থমেলা
বাইশদিন অনুষ্ঠিত হতো। মেলার
সময় নিয়ে অন্যান্য প্রকাশকের ভাবনা কি তাতো আমার জানা নেই তবে আমি মনে প্রাণে চাই
ও বিশ্বাস করি মেলার সময়কাল কমিয়ে আনলে আমরা প্রকাশকরা আরো বেশী লাভবান হব। আরো
কিছু বিষয় না বললেই নয় মেলাকে সম্পূর্ণরূপে প্যাভিলিয়ন বাদ দিতে হবে। কোন স্পন্সর
পাওয়া গেলে তাদের মাধ্যমে সব স্টল এক প্যার্টানের তৈরি করা। আর যদি স্পন্সর না
পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি তৈরি করে দিতে পারে তবে অবশ্যই মেলার ভাড়া ও
স্টল নির্মাণের টাকা সমন্বয়ের মাধ্যমে। মেলার স্টল ৮/৮ থেকে সর্বোচ্চ ৮/৩২ পর্যন্ত
দেয়া দিতে হবে। ১৯৭২ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত যে সকল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণ
করেছে সে সকল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের যেন তাদের ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর
সনদ, আর্কাইভে বই জমা প্রদানের কপি ও অগ্নিকাণ্ড ইন্সুরেন্সের কাগজ ছাড়া আর কিছু
জমা দিতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বই
জমাদানের বিষয়টি তারা বলবৎ রাখতে পারে। আরেকটি বিষয় বিক্রয় বান্ধব স্টল বিন্যাস
করতে হবে, একটা ঢাকা আরেকটা নারায়নগঞ্জ আরেকটা গাজীপুর এমন আকৃতির স্টল বিন্যাসের
ফলে অনেক প্রকাশকই লাভের মুখতো দেখেইনা মাঝে মাঝে মেলার বনিবাট্টা করাও দূরূহ ব্যাপার
হয়ে দাড়ায়। আগামী ২০২৫ একুশে বইমেলায় সার্বিক মঙ্গল কামনা করি।



দারুণ সব পর্যবেক্ষণ রয়েছে তোমার লেখায়। সাধুবাদ জানাই।
উত্তরমুছুনদারুণ সব পর্যবেক্ষণ রয়েছে তোমার লেখায়। সাধুবাদ জানাই।
উত্তরমুছুনThanks
মুছুন