মুক্তিযুদ্ধ, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাঙালী উজবুক
।।পাক বেতারে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার সম্পর্কে তথ্য ও বেতার দপ্তরের মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন।।
রাওয়ালপিন্ডি ২২শে জুন (এপিপি)।
পাকিস্তানের তথ্য ও বেতার দপ্তরের মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন আজ জাতীয় পরিষদে বলেন যে, পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মর্যাদার পরিপন্থী এমন সকল রবীন্দ্রসঙ্গীত ভবিষ্যতে পাকিস্তান বেতারে প্রচার করা হইবে না এবং অন্যান্য সঙ্গীতের প্রচার হ্রাস করা হইবে।
বিরোধী দলীয় সদস্য জনাব মজিবর রহমান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী উপরোক্ত মন্তব্য প্রকাশ করেন।
দৈনিক সংবাদ, ২২ জুন ১৯৬৭
-------------------------------------------------------------
।। পাকিস্থানে রবীন্দ্রসঙ্গীত।।
ঢাকা বেতার কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ, সম্প্রতি এই বলে সমস্ত শিল্পীদের সাবধান করে দিয়েছেন যে, যদি তাঁরা অবিলম্বে রবীন্দ্র-সঙ্গীত বন্ধ করার জন্য সরকারী নির্দেশের সমর্থনে একটি বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর দান না করেন, তাহলে বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁদের সমস্ত অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হবে।
পাকিস্থানের 'কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার দপ্তরের প্রচারমন্ত্রী শ্রীখাজা শাহাবুদ্দিন ইতিপূর্বে এ বিষয়ে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তা 'অমৃতে'র পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে।
দৈনিক সংবাদ : ১৯৬৭
------------------------------------------------------------
।।ভারত-বিদ্বেষী ভুট্টোর আকস্মিক রবীন্দ্র-প্রেমের নেপথ্যে।।
আমার বন্ধু ভোলানাথকে তার এক বন্ধু একটা বিশেষ অবস্থায় "ভোঁয়াৎ" বলে ফেলতো। সেটা নির্ঘাৎ একটা বিকারগ্রস্ত অবস্থা। কিন্তু প্রাপ্তন পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব ভুট্টো যখন রবীন্দ্র ভক্ত হয়ে পড়েন তখন সেটা যতই অস্বাভাবিক শোনাক না কেন, বিকার মনে করা চলেনা কিছুতেই। কারণ, রাজনীতির খেলোয়াড় ভুট্টো সাহেব 'অকারণ কথা খরচ করবার মত কাঁচা লোক নন। ইনি রাজনীতিরই খাতিরে ভারত বিদ্বেষ এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন যে, জাপানে জলোচ্ছাস হলেও ভারতকে দায়ী করেন। তাহলে ? তাহলে এ হেন ভুট্টো মশায়ের সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে এসে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবার কারণ কি ?
পূর্ব পাকিস্তানের সন্তান রবীন্দ্রনাথ সমগ্র পাকিস্তানের সম্পদ। রবীন্দ্রনাথের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসাবে তিনিও গর্বিত। সাবাস! অথচ পাকিস্তান রেডিওতে যখন রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ হয়েছিল, তখন তিনি কিন্তু এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেন নি। আসল ব্যাপার হচ্ছে, আগামী দেড় বছরের মধ্যে পাকিস্তানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। যাঁরা ঐ পদে বসতে চান, তাঁরা এখন থেকেই তার জমি তৈরি করছেন। কয়েক বছর আগে আয়ুব খাঁর যে "শক্ত মানুষ" চেহারা ছিল, সেটা এখন একটু ম্লান হয়েছে। তিনি অসুস্থ এবং বয়সও বেড়েছে। জখম শরীর নিয়ে নির্বাচনী প্রচারের ব্যাপক, সফরের ধকল তিনি সামলাতে পারেন কি না সে বিষয়ে সকলেই উদ্বিগ্ন ছিল।
শোনা যায় উচ্চচুতলার কয়েকজন সামরিক অফিসার নাকি ইতিমধ্যেই তাঁতে অনুরোধ জানিয়েছেন ৭০ সালে নির্বাচনে না দাঁড়াতে। প্রকাশ্যে একই পরামর্শ দিয়েছেন সরকার সমর্থন পুষ্ট "পাকিস্থান টাইমস" পত্রিকা।
ভারতীয় সংবাদ পত্র নাম জানা যায়নি।
-----------------------------------------------------------
১৯৬৭ সালে আমরা ছিলাম অখণ্ড পাকিস্থানের অংশ। ১৯৬৭ সালে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের কেউ হয়তো কল্পনা করেননি যে ৪ বছর পর ১৯৭১ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হবে। যদি এ ভাবনা মাথায় থাকতো তবে ১৯৭০ নির্বাচনে বাঙালী অংশগ্রহণ করতো না। সে হিসেবে ১৯৬৭ সালে অফিসিয়ালি আমরা পাকিস্থানি নাগরিক। এ বিষয়ের অবতারনা এজন্য তখন ৪০ জন ব্যক্তিত্ব নাকি রবীন্দ্র সঙ্গীত বন্ধের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন সেখানে প্রয়াত লেখক, সাংসদ বেবী মওদুদের পিতা ঢাকা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি মরহুম আব্দুল মওদুদ থেকে শুরু করে আমার দাদা প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, প্রকাশক, ঢাকা হাইকোর্টের অনুবাদক ও রেজিষ্টার মরহুম মোহাম্মদ নাসির আলী সহ আরো ৩৮ ব্যক্তির নাম আসে। উপরে প্রকাশিত সংবাদ থেকেই বুঝতে পারছেন তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সরকারী চাকরির দোহাই দিয়ে এবং লেখক ও প্রকাশক হিসেবে সর্বমহলে ব্যাপক পরিচিতির সুবাদে তার নাম সেখানে জুড়ে দেয়া হয়। এ জুড়ে দেয়ার অন্যতম কারিগর ছিল কবি মরহুম তালিম হোসেন ও তার সহধর্মিনী কথাসাহিত্যিক মরহুমা মাফরুহা চৌধুরী। কবি ফররুখ আহমেদ কবি তালিম হোসেন বরাবরই পাকিস্থান পন্থী হিসেবে পরিচিত ছিল ইতিহাস ঘাটলে তা জানা যাবে। বিবৃতির বিষয়টি মিথ্যা তবে নাম তালিকায় থাকার কারনে অনেকের কাছে তা সত্য। এখন সত্য বা মিথ্যা তা বিশ্বাস করানোর ক্ষমতা আমি কেনো কারো নাই। তবে আমার ছোট মাথার বিবেক বুদ্ধি বলে যদি বিবৃতি দিয়েও থাকে তা তখন তাদের দেশ যা পাকিস্থান রাষ্ট্র ছিল। সে হিসেবে বিবৃতি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেটাই হোক সেটার সাথে বাংলাদেশের কোন সম্পর্ক ছিলনা। ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর পূর্ব পাকিস্থানের বাঙালী জনগণের সমান মূল্যায়ন, বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা সহ আরো কিছু বিষয়ের নিষ্পত্তি হলে হয়তো স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য কোন যুদ্ধই সংগঠিত হতো না। স্বৈরাচারীর দোসররা এই তথ্য ও ১৯৭১ সালের ১৭মে পাকিস্থানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে বিবৃতির মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতি করেছে। এ তথ্য ভুল প্রমাণ করে আমরা হাইকোর্টের মাধ্যমে রায়ও পেয়েছি। কতটা উজবুকের দেশে বাস করি মুক্তিযুদ্ধ বেইচা খাইতে খাইতে ১৯৬৭ সালের ব্যক্তি কেন্দ্রিক বিষয়কে মুক্তিযুদ্ধের সাথে মিলাইয়া ফালাইছে।
আমরা আজও বাংলাদেশের বাঙালী হয়ে উঠতে পেরেছি। এখনও আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি অন্যের সংস্কৃতি নিয়ে টানাটানি করার। আগে নিজে সঠিক বাঙালী হয়ে উঠুন তারপর সমালোচনা করুন।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন