ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রূপে অপরূপ বাংলাদেশ (ঢাকা বিভাগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস) / গ্রন্থনা, সংগ্রহ ও সম্পাদনা সুশোভন ইফতেখার
ঢাকা বিভাগ
![]() |
ঢাকা বিভাগের মানচিত্র |
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী ও বিভাগীয় শহর। ১৭ টি জেলা নিয়ে ঢকা বিভাগ গঠিত হলেও শাসন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রকরণের ফলে ৪টি জেলা কেটে ময়মানসিংহ বিভাগ করা হয়েছে। ফলে এখন ঢাকা বিভাগে জেলার সংখ্যা ১৩টি। দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে ঢাকা বিভাগ অন্যতম। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে ঢাকা বিভাগ অত্যান্ত সমৃদ্ধশালী, ইতহাসে ভরপুর।
ঢাকা বিভাগের সীমানা :- উত্তরে ময়মানসিংহ, দক্ষিণে বরিশাল বিভাগ, পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগ ও সিলেট বিভাগ, পশ্চিমে রাজশাহী বিভাগ।
আয়তন :- ২০,৩৯৫.০৪ বর্গকিলোমিটার।
লোকসংখ্যা প্রায় :- ৩,৬৪,৩৩,৫০৫জন।
মোট জেলা ১৩টি, যথা :- ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী ও গোপালপুর।
উপজেলা :- ৮৮টি।
সিটি কর্পোরেশন :- ৪ টি।
পৌরসভা :- ৫৬ টি।
ইউনিয়ন পরিষদ :- ৮৭২টি।
মৌজা :- ৮,৯৩০টি।
গ্রাম :- ১৫,৬৬৭ টি।
এই বিভাগে রয়েছে অংখ্য পর্যটন কেন্দ্র। যেমন :- ঢাকেশ্বরী মন্দির, লালবাগ দূর্গ, কার্জন হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় সংসদ ভবন, জাতিয় জাদুঘর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হোসেনি দালান, তিন নেতার মাজার, ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয় ক্যাম্পাস, বাহাদুর শাহ পার্ক, রমনা পার্ক, নভোথিয়েটার, ফ্যান্টাসী কিংডম। শহর থেকে একটু দূরে সাভারে রয়েছে জাতীয় স্মৃতি সৌধ, গাজীপুর জেলায় রয়েছে ভাওয়ালগড়, নারায়নগঞ্জে পানামানগর, নরসংদীর উয়ারী বটেশ্বর, মুন্সিগঞ্জের ইন্দ্রাকপুর কেল্লা, মানিকগঞ্জে বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, ফরিদপুরে মধুরাপুর দেউল, মাদারীপুরে ডানলপ সাহেবের নীলকুঠি, রাজবাড়ির রাণীবহের জমিদারবাড়ি, টাঙ্গাইলের মধুপুরগড়, শরীয়তপুরে ভোজেশ্বরের মৃত বন্দর, ও মনসাবাড়ি ইত্যাদি।
স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব :- নবাব আব্দুল লতিফ, নবাব স্যার সলিমুলল্লা,
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, শহীদ
আসাদুজ্জামান, মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খা, খান আতাউর রহমান,
আবুল মনসুর, কবি জসিম উদ্দিন আহম্মেদসহ
অনেকেই। ’’
ঢাকা জেলা
ঢাকা জেলার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:- পূবেই বলা হয়েছে ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। তবে ঢাকা নামের উৎপত্তি নিয়ে অনেক ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন ঢাকাতে “ঢাক” নামে একটি বৃক্ষ ছিল, সে থেকেই ঢাকার নামকরণ করা হয়েছে ঢাকা। আবার প্রবীণদের মতে বলল্লাল সেন কর্তৃক নির্মিত ঢাকেশ্বরী মন্দির নির্মাণ করায় ঢাকার নামকরণ করা হয়েছে ঢাকা। তবে জনশ্রুতি আছে ১৬১০ খ্রীষ্টাব্দে ইসলাম খাঁ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাক বাজিয়ে যতদুর পর্যন্ত ঢাকের শব্দ শোনা গিয়েছিল, ততদুর পর্যন্ত ঢাকার সীমানা নির্ধারণ করে নামকরণ করে ছিলেন ঢাকা। ১৭৭২ সালে জেলায় উন্নত করা হয়েছে।
সীমানা :- উত্তরে গাজীপুর ও টাঙ্গাইল, দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জ, পূর্বে নারায়নগঞ্জ, পশ্চিমে মানিকগঞ্জ জেলা।
আয়তন :- ১,৪৬৩.৬০ বর্গকিলোমিটার।
জনসংখ্যা :- ১,২০,৪৩,৯৭৭ জন। পুরুষ ৬৫,৫৫,৭৯২ জন, মহিলা ৫৪,৮৮,১৮৫ জন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের ত্যথানুসারে।
সিটি কর্পোরেশন :- ২টি।
মেট্রোপলিট থানা :- ২১টি।
উপজেলা :- ৫ টি।
ইউনিয়ন ৫টি।
মৌজা :- ৮৪১টি।
গ্রাম :- ১৮৬৩টি।
২১টি মেট্রেপিলিটন থানাসহ থানার সংখ্যা ২৬টি।
যেমন :- কোতোয়ালী, সুত্রাপর, মতিঝিল, ডেমরা, রমনা, লালবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মাদপুর, তেজগাঁও, ক্যান্টনমেন্ট, গুলশান, সবুজবাগ, উত্তরা, পলবী, শ্যামপুর, খিলগাঁও, বাড্ডা, কাফরুল, কামরাঙ্গিরচর, ও হাজারীবাগ।
মট্টোপলিটন এলাকার বাইরে ৫টি। যেমন :- কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ, ধামরাই, সাভার ও দোহার।
যাতায়াত ব্যবস্থা :- দেশের যে কোনো স্থান হতে সড়কপথ, রেলপথ, নৌপথ ও বিমানপথে ঢাকায় যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশেষ দশর্নীয় স্থান :- লালবাগের কেল্লা, জাতীয় সংসদ ভবন, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, আহসান মঞ্জিল, নভোথিয়েটার ও অন্যান্য।
স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব :- নবাব আব্দুল লতিফ, নবাব স্যার সলিমুল্লা, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, শহীদ আসাদুজ্জামান, মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খা, খান আতাউর রহমান, আবুল মনসুর, কবি জসিম উদ্দিন আহম্মেদসহ অনেকেই। ’’
প্রধান নদ-নদী :- বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতি, শীতলক্ণ্যা, পদ্মা, মেঘনা, কালীগঙ্গা, বংশী, তুরাগ, বালু, সিংহ, এলামজানী, ভিরুজখা, রামকৃষ্ণাদী, ইলিসামারী ও তুলসীখালি।
বুড়িগঙ্গা
পৃথিবীতে যত উন্নত ও আধুনিক দেশ আছে তার প্রায় সব দেশই নদী বা সমুদ্র কেন্দ্রিক। কোনো না কোনো নদিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেঠে শহর বা নগর। আমাদের রাজধানি শহর এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের ঢাকা শহর যে নদিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তার নাম বুড়িগঙ্গা। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে আঠারো শতকের শেষের দিকেও বুড়িগঙ্গা ছিলো গঙ্গার মুলধারা। বর্তমানে এ নদি ধলেশ্বরী নদীর শাখায় রূপান্তিত হয়েছে। আর এ বুড়িগঙ্গা নিয়ে অসংখ্য ইতিহাস। বুড়িগঙ্গার উৎপত্তি হিসেবে হিন্দু ধর্মালম্বিদের পুরাণ মতে,“মহামুনি জমদগ্নির আদেশে পুত্র পরশুরাম মাতৃহত্যা করে মারাত্মক পাপ করেছিলেন। যে কুড়াল দিয়ে পরশুরাম মা রেণুকাকে বধ করেছিলেন সে কুড়াল পশরামে হাতে আটকে যায়। কোন অবস্থাতেই পশুরামের হাত হতে কুড়াল ছাড়ানো যাচ্ছিল না। অবশেষে পশুরাম দুঃখ ও বেদনা এবং অনুশোচনায় মানষিকভাবে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বনজঙ্গলে ঘুরে তপস্যা করতে লাগলেন। হাঠাৎ তিনি ব্রহ্মপুত্রের মহত্ম্যের কথা শুনে আশায় বুক বেঁধে তাকে খুঁজতে লাগলেন। ব্রহ্মপুত্র তখন একটি হৃদরূপে হিমালয় পবর্তে আত্মগোপন করে ধ্যানে মুগ্ধ ছিলেন। বহু বছর হিমালয় পাহাড়ে অপেক্ষার তাঁর পাপ লাঘব হলো। পরশুরাম দেখতে পেলেন হিমালয়ে নিচে প্রশাস্ত একটা হৃদ। তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঝাঁপ দিলেন ব্রহ্মপুত্রের বুকে। তারপরই তাঁর হাত থেকে কুড়ালখানা ছুটে যায়। পরশুরাম বুঝতে পারলেন তার পাপ মোচন হয়েছে। সর্বপাপ হরণকারী ব্রহ্মপুত্রের এ পবিত্র জল দুনিয়ার সব মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য মনে বাসনা নিয়ে পরশুরাম তার কুড়ালটিকে লাঙ্গলের রূপ দিলেন এবং সে লাঙ্গল দিয়ে ব্রহ্মপুত্রকে টেনে নিয়ে আসেন সমভূমিতে। এভাবে বহুদিন লাঙ্গল টানার পর বর্তমানে লাঙ্গলবন্দে এসে তাঁর লাঙ্গলটি আটকে যায়। এতে পরশুরাম বুঝতে পারলেন তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এবার তিনি নদির মহাত্মা প্রচারে তীর্থযাত্রায় বের হলেন। আণ্যদিকে যেখানে এসে ব্রহ্মপুত্র থেমে গেল তার কাছ দিয়েই বয়ে যাচ্ছিল যৌবনা, চঞ্চলা অপরূপ সুন্দরী নদী শীতলক্ষ্যা। শীতলক্ষ্যার রূপ যৌবনের কথা শুনে তাকে দেখার জন্য শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্র প্রচন্ড স্রোতের আঘাতে দুই ভেঙ্গে ধাবিত হলো তার দিকে। শীতলক্ষ্যাা শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্রের গর্জণ শুনে ভীত সন্ত্রন্ত হয়ে তার সৌন্দর্য লুকিয়ে এক বৃদ্ধার রূপ নিজেকে বুড়িগঙ্গারূপে উপস্থিত হলো। ব্রহ্মপুত্র আশাহত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, হে বৃদ্ধা নারী কোথায় সেই অপরূপ যৌবনা শীতলক্ষ্যা ? লক্ষ্যা মৃদু হেসে জবাব দিলেন, আমিই সে লক্ষ্যা।” ব্রহ্মপুত্র ধাবিত হলো লক্ষ্যার দিকে এবং লক্ষ্যাকে দেখে মুগ্ধ হলো। সেখানেই তাদের মিলন হয়ে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে গেল। তারই একটা স্রোত বয়ে চলছে আজও বুড়িগঙ্গা নাম ধারণ করে।
লালবাগের আওরঙ্গবাদ কেলল্লা
বিশ্বের প্রায় সব নগরীতেই কোনো না কোনো প্রাচীন নিদর্শন বা স্থাপনার জন্য বিখ্যাত এ কথা আমাদের মানতেই হবে। যেমন: ঐতিহাহিক নগরী ঢাকাও তেমনি এক পুরাকীর্তির জন্য বিখ্যাত। যার বর্তমান নাম লালবাগ দূর্গ। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে এটি নির্মাণ করা হয়। ইতিহাস সুত্রে জানা যায় সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র যুবরাজ আজম শাহ্ ১৬৭৮ সালে সুবেদার হয়ে ঢাকায় এসেই মোগল স্থাপতশৈলী অনুসরণ করে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এবং তার নামকরণ করেন কেলল্লা আওরঙ্গবাদ। তিনি দূর্গ নির্মান করার জন্য বুড়িগঙ্গা নদির উত্তরের স্থানটি বেছে নেন। সে জায়গাটির নাম ছিল লালবাগ। আজম শাহ্ ছিলেন উৎসাহী নির্মাতা। প্রথমে তিনি একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মান করেন। পরের বছরই আঙরঙ্গজেব মাঠাঠাদের মোকাবেলা করার জন্য আজম শাহকে দিল্লী ডেকে পাঠান। আজম শাহ্ এর স্থলে নিয়োগ পান শায়েস্তা খাঁন। শায়েস্তা খান ১৬৮০ সালে ঢাকায় এসে দূর্গের নির্মান কাজে হাত দেন। এরমধ্যে ১৬৮৪ সালে তার আদরের কন্যা পরিবিবি মারা গেলে তিনি অশুভ লক্ষণ মনে করে দূর্গের কাজ বন্ধ করে দেন। শায়েস্তা তার কন্যা পরিবিবিকে দরবার হল ও মসজিদের মাঝখানে সমাহিত করে তার ওপর চিত্রাকর্ষক সৌধ নির্মান করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তাকে সমীহ করে দূর্গের স্বত্ব দান করেন। এরপর শায়েস্তা খা অবসর নিয়ে ১৬৮৮ সালে আগ্রা ফিরে যান। শায়েস্তা খা ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নানা কারনে দূর্গের গুরুত্ব কমে যায়। ১৭০৪ সালে ঢাকা হইতে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানআন্তর করা হয়। ও দিকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর দূর্গ চরম অবহেলা ও অযন্ত্রের শিকার হয়। ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা সরকারী প্রতিষ্ঠান এর দায়িত্ব নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করেন। ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৩ সালে পুরানা পল্টন হইতে সেনানিবাস লালবাগ দূর্গে সেনানিবাস স্থানান্তর করেন।
পূরানো ঢাকার লালবাগ কেল্লা
মূঘল স্থাপত্যের অন্যতম ও আকর্ষনীয় নিদর্শন লালবাগ কোলল্লা। প্রায় সাড়ে তিনশত বছর পূর্বে এই দূর্গ নির্মান করা হলেও এখনো ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে সগৌরবে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে বুড়িগঙ্গা নদীর কোল ঘেঁষে ঢাকার লালবাগ এলাকায়। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা ফলে বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে সেনানিবাস ও রাজপ্রাসাদের সমন্ময়ে লালবাগ কেলল্লার কাজ শুরু করেন। কিন্তু দূর্গের কাজ সমাপ্ত না হতেই ১৬৭৯ সালে সম্রাট মারাঠাদের দমন করার জন্য শাহজাদাকে দিল্লী ডেকে পাঠান এবং তার পরিবর্তে পুনরায় শায়েস্তা থাঁনকে নিয়োগ দেন। একে তো শায়েস্তা খাঁন নির্মান কাজে উৎসাহী ছিলেন না, তথাপীও ১৬৮০ সালে ঢাকায় আসার পর দূর্গের অবশিষ্ট কাজ সমাপ্ত করার আগেই শায়েস্তা খানের আদরের কন্যা পরিবিবি ইন্তেকাল করিলে শায়েস্তা খান দূর্গের কাজ সমাপ্ত করা তাহার জন্য শুভ লক্ষণ নয় মনে করে দূর্গের কাজ বন্ধ রাখেন। পরে দরবার হল ও মসজিদের মাঝামাঝি স্থানে পরি বিরির মাজার নির্মান করেন। সম্রাট আওঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে বয়োজোষ্ঠ হিসাবে খুবই সমিহ করতেন, তই তিনি দূর্গের দায়ভার শায়েস্তা খানের ওপর অর্পণ করেন। অতঃপর শায়েস্তা খান ১৬৮৮ সালে অবসর নিয়ে আবার তিনি আগ্রায় চলে যান। লালবাগ দূর্গের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা। যেমন ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হলে লালবাগ কোলল্লা হতে দেশীয় সিপিহিরা বিদ্রোহ্ করে। লালবাগ দূর্গে আজও যে সমস্ত ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন গুলো মাথা উচু করে ধ্বংসবাশেষ দাঁড়িয়ে আছে। সে গুলো হলো দৃষ্টি নন্দন তিন গুম্বুজ লালবাগ দূর্গ মসজিদ, লালবাগ কেলল্লার ২০ ফুট উচ্চতার প্রতিরক্ষা প্রাচীর, কামান বিহীন তোপমঞ্চ, আত্মরক্ষার জন্য সুড়ঙ্গপথ। দক্ষিণে রয়েছে তিন তলা সমান উচু তোরণ, পরিবিরির সমাধিসৌধ, দরবার হল, হাম্মামখানা, শহীদ সিপাহীদের সমাহিত পুকুর ও বিশাল বাগান। এই মোগল স্থাপনা স্বচোখে দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার দশনার্থীা দূর্গ দেখতে আসে।
পরি বিবির সমাধিসৌধ
লালবাগ দূর্গের মুল আকর্ষণ পরিবিবির সমাধিসৌধ। সুবেদার শায়েস্তা খন তাঁর অতি আদরের কন্যা পরিবিরির অকাল মৃত্যুতে তাকে চিরস্বরণীয করে রাখার জন্য ১৬৮৪ সালে এই সৌথ নির্মাণ করেন। আগ্রার তাজমহল ও দিল্লীর হুমায়নের সমাধীর আদলে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর অভ্যন্তরে নির্মান কাজে হিন্দু, মুসলিম স্থাপত্যকলার সংমিশ্রন ঘটানো হয়েছে। কন্যা বিয়োগান্তের এমন অমর কীর্তি শুধু উপ মহাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই বিরল।
লালবাগ দূর্গের পুকুরই শহীদ সিপাহিদের স্মৃতি
লালবাগ দূর্গের দরবার হলের পূর্ব প্রান্তে জলাশুন্য আয়তাকার একটি পুকুর চারিদিকে দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। মুলত দূর্গে বসবাসরত কর্মচারীদের পানির চাহিদা মিটানোর জন্য এটি খনন করা হয়েছিল। এবং এর দক্ষিণ ও উত্তর পাশে ইট বিছানো ঘাট বাঁধানো ছিল। এখন সে সবের অস্থিত্ব নেই। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহে দেশি যে সব সিপাহি শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের লাশ এই পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে এমনটি কিংবদন্তী হয়ে আছে।
হোসোনী দালান
পুরানো ঢাকায় নিমতলী এলাকায় ১৬৪২ সালে গড়ে উঠেছে এই হোসেনি দালান। তৎকালীন বাংলার মোগল সুবেদার শাহ্ সুজার নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ স্বপ্নে আদিষ্ঠ হয়ে হযরত ইমাম হোসেন (রঃ) পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে এই ইমারত নির্মান করেন। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মাদ (সঃ) এর দৌহিদ্র, হয়রত আলীর ও নবী করিম (সঃ) এর অতি প্রিয় কন্যা ফাতেমার সন্তান ১০ মহরম হযরত ইমাম হোসেন (রঃ) কারবালার যুদ্ধ ইয়াজিদের হাতে নিহত হন। কারবালার সেই হৃদয় বিদয়ক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শিয়া সম্প্রদায় এখানে ৬-১০ মহরম কারবালায় শহীদদের স্মরণে দিবসটি পালন করে থাকে।
আহসান মঞ্জিল
পুরানো ঢাকায় ইসলামপুর এলাকায় আহসান মঞ্জিল। ব্রিটিশ শাসনামলে তাদের দেওয়া নবাব উপাধী প্রাপ্তরা এই ভবনে বসবাস করিতেন। কিংবন্দিতি আছে অষ্টাদশ শতাব্দিতে জালালপুর পরগোনার জমিদার সেখ ইনায়েত উলল্লাহ্ প্রমোদ ভবন হিসাবে নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে নানা হাত ঘুরে এর নামকরণ করা হয়েছে আহসান মঞ্জিল। এই মঞ্জিলে মোট ২৩ গ্যালারী রয়েছে। গ্যালারীগুলো সংরক্ষিত আছে নবাবদের ব্যবহৃত হরেক রকম জিনিষপত্র। যেমন নানা জীব-জন্তুর ড্রেসিং টেবিল, চিনামাটির তৈরী আলমারী, আলনা, ঢাল- তোলোয়ার , বেড রুম, ড্রয়িংরুম, নাচ ঘর, লাইব্রেরী, নবাব পরিচিতি কক্ষ, নবাব সলিমুল্লা কক্ষ। পাটাতন বিশিষ্ঠ বৈঠকখানা। যা দেখে নবাবী শাসনামলকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দির
ঢাকায় বকশীবাজারস্থ ঢাকেশ্বরী মন্দির বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের জাতীয় মন্দির। হিন্দু সনাতন ধর্মাবল্মীরা এখানে প্রতি দিন পূজা- অচর্ণা করিতে আসে। মন্দিরের সুপ্রশস্ত প্রাঙ্গণে চারটি মাঝারী আঁকারের শিব মন্দির আছে। মন্দিরের অমূল্য সম্পদ অষ্টধাতুর আসল ঢাকেশ্বরী মুর্তীটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চুরি করে নিয়ে গেছে। দূর্গা পূজার সময় এই মন্দিরে অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটে। এছাড়াও প্রতিদিন হিন্দু সম্প্রদায় মানুষের সকাল-সন্ধ্যা ধর্মযজ্ঞ চলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শাহ্বাগ এলাকায় ঐতিহ্যবাহী প্রাচ্যের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জনকল্যাণ মুখী যত আন্দোলন, প্রতিবাদ জানানো হয়েছে তার প্রথম সুত্রপাত দিক ও পথ নির্দেশনা ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে। এখানে রয়েছে টিএসসি অর্থাৎ (শিক্ষক ও তরুণ ছাত্রদের বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছাস,মুক্তবুদ্ধি চর্চার মিলন কেন্দ্র। এছাড়াও এখানে রয়েছে কার্জন হল, কলা ভবন, সুর্য সেন হল, মহসিন হল, সলিমুলল্লা মসলিম হল, জগন্নাথ হল, বঙ্গবন্ধু হল, জসীমউদ্দিন হল, সামসুন নাহার হল, রোকেয়া হল, শহীদ জিয়া হল। এর পাশেই রয়েছে চারুকলা ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থাগার, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় মসজিদ, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীন, ড, মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ্ সমাধী। বুয়েট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, কেন্দ্রী শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমি, পরমানু শক্তি কমিসন ইত্যাদি।
জাতীয় শহীদমিনার
ঢাকার শিক্ষা অর্জণের প্রাণকেন্দ্রে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশায় স্থাপিত হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সম্মুখে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে এই শহীদ মিনার। উলেখ্য ১৯৪৭ সালে বিট্রিশ শাসন হতে মুক্ত হয়ে ১৪ আগস্ট জন্ম নেয় পাকিস্তান ও ভারত। পাকিস্তানে ২টা প্রদেশে বিভক্ত। স্বল্পতম জনগোষ্টি ও বিশাল এলাকা এলাকা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান। বিশাল জনগোষ্টি ও স্বল্প আয়তন নিয়ে এ অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান। জনগোষ্টির দাবী নিয়ে গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই দাবীর প্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালে আন্দোলনরত মিছিলের ওপর পাক বাহিনী গুলি চালিয়ে হত্যা করেন। নিহত হন রফিক, সালাম, বরকতসহ অনেকেই। তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নির্মাণ করা হয়েছে এই শহীদ মিনার। ১৯৬৩ সালের ২১ ফ্রেরুয়ারী এটি উদ্ভোধন করেন শহীদ বরকত এর মা হাসিনা বেগম। এরপর হতেই প্রতি বছর ২১ ফ্রেরুয়ারী রাত ১২.০১ হতেই শোক র্যালী করে পুস্পস্তবক অর্পণ করে বিনম্র শদ্ধা জানানো হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনতা লাভ করিলে ইহা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এখানা জাতির বিভিন্ন্ দূর্যোগে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জানানোর প্রতীক।
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়
দেশের একমাত্র আবার্সিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর সাভারে অবস্থিত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও পরিবেশের সাথে আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা হয় না। ঢাকা শহরের কোলাহর মুক্ত প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে জাহাঙ্গীর নগর এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভিতর ১০/১২ ছোট বড় খাল রয়েছে। ঘোরানো ফেরানো আঁকাবাঁকা রাস্তা গুলির পাশে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গাছ গাছালি। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে অভয় আশ্রায়ের সন্ধানে প্রতিবছর শীতকালে বহু অতিথি পাখির আগমন ঘটে এই বিশ্ববিদ্যালয়েে জলাধারে। তথ্য সুত্রে জানা যায় প্রায় ১৯২ টি প্রজাতির পাখির অস্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে বেছে নেয়। পাখিদের কিচিরমিচির, কুজন, কুহুতানে মুখরিত হয়ে থাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
চিড়িয়াখানা
ঢাকায় মিরপুর ১ নম্বর সেকসনে বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশেই জাতীয় চিড়িয়াখানা। ৯৩ হেক্টর জায়গা জুড়ে চিড়িয়াখানা যেন পশুর রাজ্য। হরেক রকম পশু পাখি, জীব- জানোয়ার পাশাপাশি সুন্দর সুন্দর গাছ পালা।
চিড়িয়াখানার রয়েছে বাংলার গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, কুমির, জলহস্তি, গন্ডা, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, চিত্রা হরিণ, বানর হুনুমান, ময়ুর , ঘড়িয়াল, চিতা বাঘ, উট পাখি, উট, হাতি হায়না, শুকুর, ভোঁদড়, জিরাফ, জেব্রা, পলিকান, বনমানুষ ইত্যাদি। ধশে, লক্ষীপেচা, ভূবনচিল, কাকা, শুকুন, শঙ্খপেঁচা ছাড়াও শীত মৌসুমে হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটে। শীত মৌসুম শেষ হলেই আবার অতিথি পাখিরা ফিরে যায় নিজ নিজ দেশে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ
সড়কপথে উত্তরবঙ্গ অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গ হতে রাজধানী ঢাকা শহরের প্রবেশ মুখেই সাভার নবীনগর এলাকায় ঢাকা আড়িচা মহাসড়কের কোল ঘেঁষে ১০৯ একর ভূমির ওপর নির্মান করা হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত স্থাপনা জাতীয় স্মৃতিসৌধ। উলেখ্য ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এদেশের মুক্তিকামী মানুষের সাথে শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। বাঙ্গালী জাতির কাছে যার নাম মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ্য ৯ মাস রক্তক্ষয়ি যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর আত্ম-সমপর্নের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে। এদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে (মুক্তিযুদ্ধে) ৩০ লক্ষ দেশ প্রেমিক মানুষ শহীদ হন। সেই ৩০ লক্ষ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রথমে ৮৪ একর ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছিল এই জাতিয় স্মৃতিসৌথ। পরে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার জন্য আরও ২৫ একর ভূমির উপর বৃক্ষ রোপন করে পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই স্মৃতিসৌধ দশর্নীয় ও দৃষ্টিনন্দন করার জন্য ত্রিভূজ আকৃতির ৭টি মিনারে ৭টি ইতিহাস বুঝানো হয়েছে। যেমন : বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্ন’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্ন’র আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ৬দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান এবং ৭১ স্বাধীনতা যুদ্ধ। ৪৫ মিটার অর্থাৎ ১৫০ ফুট উচু মিনারটি মধ্য বিন্দুতে অবস্থিত। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গ Ÿন্ধু সেখ মুজিবর রহমান এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং ১৯৮৮ সালের জুন মাসে এর সকল নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এই মিনার ঘিরে রয়েছে কৃত্রিম হৃদ এবং মনোরম ফুলের বাগান। স্মৃতিসৌধ চত্বরে রয়েছে মাতৃভূমির জন্য আত্মৎসর্গকারি অজ্ঞাতনামা শহীদদের ১০টি গণকবর। আছে উম্মুক্ত মঞ্চ, অভ্যর্থনা কক্ষ, মসজিদ, হেলিপ্যাড এবং ক্যাফেটেরিয়া। স্মৃতিসৌধের মিনার স্থাপত্য নকশা করেছিলেন বাংলাদেশের খ্যাতনামা স্থপতি মরহুম সৈয়দ মঈনুল হোসেন। তিনি ২০১৪ সালে ইস্তেকাল করেন। এই স্মৃতি সৌধে প্রতিদিন হাজার দেশী বিদেশী পর্যটক ও দশর্নথিীরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসে। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় অতিথিরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসে। পরিদর্শন বইয়ে লিখে যায় তাদের অনুভুতি ও আবেগের কথা।
জাতীয় জাদুঘর
দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য জাদুঘরের বিকল্প নেই। আমাদের দেশে বিচিত্র অনেক ধরনের জাদুঘর রয়েছে। তবে সব চেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপুর্ন জাদুঘর ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শাহবাগ মোড়ের জাদুঘর। যা পরবর্তীতে জাতীয় জাদুঘরে রূপান্তিত করা হয়েছে। ঢাকা জাদুঘরের সুচনা ১৯১৩ সালের ২০ মার্চ। জাতীয় জাদুঘরের মর্য্যদা লাভ করেছে ১৯৮৩ সালে। বাংলার বহু ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ঢাকা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। রাস্তা পাড় হলেই বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। অপর দিকে বারডেম হাসপাতাল। জাদুঘরের পাশেই চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়, কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরী, মসজিদ। সামনেই সরোওয়ারর্দ্দী উদ্যান। জাতীয় জাদুঘর নৃবিজ্ঞান, চারুকলা, ইতিহাস, প্রকৃতি, শিল্পকলা, জাতিতত্ব অলঙ্করণ, সমকালীন শিল্পকলা, আধুনিক ও বিশ্ব সভ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে ৪৩টি প্রদশনী কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষে দেশের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহাসিক স্থাপনার নিদর্শন, মানুষের অলংকার, পোশাক, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বাসনপত্র, প্রাচীন পুথি, পান্ডুলিপি, রাজা-মহারাজাদের ব্যবহৃত খাট, তালোয়ার, হাতির দাঁতের তৈরী শিতলপাটি। এছাড়াও রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের ব্যবহারিক জীবনের অনেক উপাদান। দেশের খ্যাতিমান রাজনৈতিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি ও বরণ্যে ব্যক্তিদের জীবনালোখ্য মুলক ছবি, ব্যবহারিক দ্রব্যাদীসহ অনেক কিছু। যা দেখে আতিতের ইতিহাস সহজেই পাওয়া যায়।
জাতীয় সংসদভবন
বাংলাদেশে গর্ব করার মত সবচেয়ে বড় সম্পদ তার নাম জাতীয় সংসদভবন। শেরে বাংলা নগরে ১০১.৬ হেক্টর জমির উপর পাক শাসনামলে ১৯৬২ নির্মাণ করেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। নির্মাতা মার্কিণ স্থপতি লুই আই কান। এই সংসদ ভবনের তিন দিকে রয়েছে কৃত্রিম জলাশয়। ধাতব বাউন্ডারীর পাশে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় ৯ তলা এই ভবনটি পানির উপর দাঁড়িয়ে আছে অথবা মনে হবে নীচের অংশ পানিতে ডুবে আছে অথবা পানির উপর ভাসছে। যা পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
নভোথিয়েটার
আকাশের ঐ মিটি মিটি তাঁরার সাথে আমি কইবো কথা নাই বা তুমি এলে.., প্রেমিক প্রেমিকেরা আকাশের চাঁদতারাকে সাথী ভেবে মধুর কণ্ঠে গুন গুনিয়ে গান গেয়ে মনের অনুভতি প্রকাশ করে, অথবা গ্রাম গঞ্জে মা চাচীর কণ্ঠে আজও শোনা “আয়- আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা... চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা,” ছেলে ঘুমানোর মিষ্টি ছড়া আজও গ্রাম বাংলার শোনা যায়। আকাশ নিয়ে, চাঁদ নিয়ে মানুষের ভাবনার অন্ত নেই। যা শুধু সাধারণ মানুষের ধরা ছোয়ার বাইরে থেকেই যায়। তারপরও আবিস্কারের নেশায় মানুষ ছুটছে দেশ থেকে দেশান্তরে, নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে। সফলতা পেয়েছে অনেকেই। পৃথিবীর মানুষ আজ চাঁদে বসতি স্থাপন করেছে। মঙ্গল গ্রহে মানুষের বিচরণ অব্যাহত রয়েছে। এরপরও সৌরজগত নিয়ে কত ভাবনাই না ভাবছে মানুষ। ভাবছে বলেই বিজ্ঞানের আর্শিবাদে আজ বিশ্ব হাতের মুঠোয়। তেমনি সৌরজগত নিয়েও মানুষ ভাবছে এই বিশ্বায়নের যুগে। সেই বিজ্ঞানের কল্যাণে সৌরজগত নিয়ে একশ তেতত্রিশ কোটী টাকা ব্যয়ে ৫.৪০ একর জমির উপর ঢাকার প্রাণ কেন্দ্র বিজয় স্মরণীতে স্থাপিত হয়েছে নভোথিয়েটার। ইট আর কংক্রিট দিয়ে সাজানো হয়েছে এর চারিপাশ। এই নভোথিয়েটারের মুল নকশা ও ডিজাইন করেছেন বাংলাদেশের স্থপতি আলী ইমাম। এর পুরোটাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। নভোথিয়েটার বাইরে থেকে দেখতে একটা প্লানেটারিয়াম বা ডোমের মত। টিকিট নিয়ে ডোমের ভিতর প্রবেশ করিলেই প্রথমে চোখে পড়বে একটি এক্সিবিশন হল। হলে রয়েছে সুর্য, চাঁদ এবং পৃথিবীর একটি মডেল। এর পর সৌরজগতে তারাগুলোর অবস্থান। প্লানেটারিয়ামের ঠিক মাঝখানে তৈরী করা হয়েছে এই থিয়েটার হল। হলের উচ্চতা একটা পাঁচতলা বাড়ীর সমান। নভোথিয়েটারের ডোমের ভিতরে ঢুকলে মনে হবে ছোট্ট একটা পৃথিবীতে আপনি প্রবেশ করেছেন।
এই নভোথিয়েটারের মোট আসন সংখ্যা ২৭৫ টি। পর্দায় সৌরজগতের ছবি ফুটিয়ে তোলার জন্য রয়েছে ৩২টি অতি শক্তিশালী প্রজেক্টর। পর্দায় দেখা যাবে একই সংগে ২৫ হাজারের অধিক নক্ষত্র। আকাশের মতো পর্দায় ধীরে ধীরে ভেসে উঠবে গোধুলিবেলার ঢাকা শহর। দেখবেন সুর্য ক্রমশ: নেমে যাচ্ছে পশ্চিমাকাশে। হারিয়ে যাবে সুর্যের আলো। অন্ধকার নেমে আসবে পৃথিবীতে। তারপই দেখা যাবে মাথায় ওপর মেঘমুক্ত আকাশ। আপনি ভুলে যাবেন যে, আপনি বসে আছেন একটি হলের ভেতর। আপনি ক্রমশ: জানবেন আকাশে কোন তারার কোথায় অবস্থান। জানবেন রাশিচক্রের ছায়াপথের অবস্থান। এ সময় সৌরজগত সমন্ধে একজন ভাষ্যকর বিষয়গুলো বাংলায় সুন্দর ভাবে ব্যাখা করবেন। দেখতে দেখতে মনে হবে আপনি আর এক জায়গায় স্থির নেই। যা আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। এ সময় আপনি আকাশের ভিতর দিয়ে উড়ে বেড়ানের অভিজ্ঞতা পাবেন। দেখতে পাবেন আহ্নিক গতি, দেখবেন বার্ষিক গতি। এ নভোথিয়েটারে দৈনিক ৪টি করে শো প্রদর্শন করা হয়। প্রথম শো সকাল ১১ টায়, দ্বিতীয় শো দুপুর ১ টা, তৃতীয় শো বিকেল ৩ টায়, চতুর্থ শো বিকেল ৫ টায়। কেবল শুক্রবার শো প্রদশর্নীর সময় কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০ টা, বিকেল ৩টা, বিকেল ৫টা ও সন্ধ্যে ৭টায়। বুধবার সাপ্তাহিক বন্ধ।
বায়ের বাজার বধ্যভূমি
১৯৭১ সালে পাক শাসক ও হানাদার বাহিনী তাদের পরাজয় উপলব্দি করে ১৪ ডিসেম্বর এদেশ মেধাশুন্য করার জন্য দেশের সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখকসহ অগণিত ব্যক্তিদের ধরে এনে এখানে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সে সব শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ও তাঁদের স্মরণে গড়ে তোলা হয়েছে এই স্তম্ব। প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর সর্বস্তরের মানুষ শহীদদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন কর।
বায়তুল মোকাররম
ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের শহর। পুরো ঢাকার আনাচে কানাচে নির্মাণ করা হয়েছে এ দেশের ধর্ম প্রাণ মানুষের আলল্লাহ্র এবাদত করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য মসজিদ। কোনোটি নির্মাণাধীন আবার কোনোটি ইতিহাস প্রতœসম্পদের ঐতিহ্যের নিদর্শন। দৃষ্টি নন্দন বায়তুল মোকাররম নির্মাণ করা হয় ১৯৬২ সালে শিল্পপতি আব্দুল লতিফ বাওয়ানী কাবা শরীফের সাদৃশ্যের সাথে হু-বু-হু মিল রেখে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। সরকার কতৃক পরিচালিত ৭তলা বিশিষ্ঠ এই জাতীয় মসজিদের নীচ তলার পুরোটাই মার্কেট। যার আয় মসজিদের উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়। দোতলায় ও তিন তলায় কিছু অংশে রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যালয়, কিছু অংশে রয়েছে ইসলামিক পাঠাগার ও কিছু অংশে ইসলামি গবেষনাগার। প্রতি ওয়াক্তে হাজার হাজার মুসল্লী এক সাথে কাঁতার বেঁধে নামাজ আদায় করিতে পারে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন