শহীদ জিয়ার জীবন রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ / সুশোভন ইফতেখার শাওন
![]() |
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (১৯৩৬–১৯৮১) |
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
* জন্ম: ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ সাল, বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে।
* পিতা-মাতা: তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ এবং মাতা জাহানারা খাতুন।
* শিক্ষা: শৈশব কাটে বগুড়া ও কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর পরিবার করাচিতে চলে যায়। ১৯৫৩ সালে তিনি করাচির ডিজে কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন এবং একই বছর কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সামরিক জীবন
* কমিশন লাভ: ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন।
* ১৯৬৫-এর যুদ্ধ: ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি 'হিলাল-ই-জুরাত' খেতাবে ভূষিত হন।
* মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ১ নম্বর সেক্টর এবং পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। তাঁর নামে গঠিত হয়েছিল বিখ্যাত 'জেড ফোর্স'। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে 'বীর উত্তম' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্রপতিত্ব
* ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের 'সিপাহি-জনতা বিপ্লবের' মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
* বিএনপি প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল' (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।
* উন্নয়ন কর্মসূচি: তিনি গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে 'খাল খনন কর্মসূচি', ১৯ দফা অর্থনৈতিক কর্মসূচি এবং বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন।
* পররাষ্ট্রনীতি: তাঁর সময়েই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণ
* ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। তাকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে সমাহিত করা হয়, যা বর্তমানে 'জিয়া উদ্যান' নামে পরিচিত।
* একটি ঐতিহাসিক তথ্য: ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা কর্তৃক পরিচালিত 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' জরিপে জিয়াউর রহমান ১৯তম স্থান লাভ করেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে '১৯ দফা কর্মসূচি' এবং 'খাল খনন অভিযান' ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী দুটি পদক্ষেপ
১. ১৯ দফা কর্মসূচি
১৯ দফা কর্মসূচি ছিল মূলত জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের একটি রূপরেখা। ১৯৭৭ সালে তিনি এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যার লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এর প্রধান বিষয়গুলো ছিল:
* সার্বভৌমত্ব রক্ষা: দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা।
* উতপাদন বৃদ্ধি: বিশেষ করে কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশকে খাদ্য ও সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।
* জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
* গণতন্ত্র ও সুশাসন: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা ফিরিয়ে আনা।
* শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: নিরক্ষরতা দূর করা এবং গ্রামে গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
* গ্রামীণ উন্নয়ন: গ্রামভিত্তিক সমবায় ও স্থানীয় শাসনের মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
* এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
২. খাল খনন অভিযান
জিয়াউর রহমানের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বৈপ্লবিক কর্মসূচি ছিল 'স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন অভিযান'। ১৯৭৯ সালে তিনি এই কর্মসূচি শুরু করেন। এর মূল উদ্দেশ্যগুলো ছিল নিম্নরূপ:
* সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন: শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির অভাব দূর করতে সারা দেশে ছোট-বড় অনেক খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়।
* খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা: সেচ সুবিধার মাধ্যমে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করে খাদ্য ঘাটতি মেটানো।
* জলবদ্ধতা নিরসন: বর্ষাকালে বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা যাতে ফসল নষ্ট না হয়।
* জনগণকে সম্পৃক্ত করা: জিয়াউর রহমান নিজেই কোদাল হাতে মাটি কেটে এই কাজের উদ্বোধন করতেন, যা সাধারণ মানুষকে কায়িক শ্রমে উৎসাহিত করত।
এই অভিযানের ফলে লাখ লাখ একর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আসে এবং দেশের কৃষি উৎপাদনে এক বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিশাল স্বেচ্ছাশ্রমের উদাহরণ হয়ে আছে।
মূল প্রভাব : এই দুটি কর্মসূচির মাধ্যমেই জিয়াউর রহমান তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর জনপ্রিয়তাকে সুসংহত করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে গড়ে তুলতে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ও সার্ক গঠনের ভূমিকা
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। তিনি "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়"—এই মূলনীতির ভিত্তিতে এক ভারসাম্যপূর্ণ এবং গতিশীল কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বা সার্ক (SAARC) গঠনের উদ্যোগ।
পররাষ্ট্রনীতি ও সার্ক গঠনের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সার্ক (SAARC) গঠনের উদ্যোগ
জিয়াউর রহমানই প্রথম অনুধাবন করেছিলেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ) দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট প্রয়োজন।
* আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব: ১৯৭৯-৮০ সালে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সংস্থা গঠনের লিখিত প্রস্তাব পাঠান।
* কূটনৈতিক সফর: এই প্রস্তাবের পক্ষে জনমত ও সমর্থন গঠনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নেপাল, পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফর করেন।
* মূল লক্ষ্য: তাঁর লক্ষ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপন, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা।
* বাস্তবায়ন: যদিও ১৯৮১ সালে তাঁর শাহাদাত বরণের পর ১৯৮৫ সালে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে 'সার্ক' প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু এর মূল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
২. ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল আদর্শবাদ অপেক্ষা জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ ছিল:
* মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক: তিনি সংবিধানে "বিসমিল্লাহির-রাহমানির-রাহিম" সংযোজন করেন এবং ওআইসি (OIC)-এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম দেশগুলোর সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এর ফলে বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে রেমিট্যান্স আসার পথ সুগম হয়।
* পাশ্চাত্য ও চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা: তিনি চীন ও আমেরিকার সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
* নিরপেক্ষতা: স্নায়ুযুদ্ধের সময়েও তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM)-এ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়।
৩. গঙ্গার পানি বণ্টন ও সীমানা সমস্যা
তিনি ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ঐতিহাসিক ১৯৭৭ সালের 'গঙ্গা পানি চুক্তি' সম্পাদন করেন। এছাড়াও দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ এবং সীমান্ত সমস্যা সমাধানে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।
মূল প্রভাব : জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল একাধারে বাস্তববাদী ও দূরদর্শী। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শিক্ষা সংস্কার এবং নারী ক্ষমতায়ন
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে শিক্ষা সংস্কার এবং নারী ক্ষমতায়ন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত জনশক্তি এবং কর্মক্ষম নারী সমাজ ছাড়া একটি জাতি স্বনির্ভর হতে পারে না।
প্রধান উদ্যোগগুলো তুলে ধরা হলো:
১. শিক্ষা সংস্কার কর্মসূচি
জিয়াউর রহমান শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন:
* গণশিক্ষা ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ: ১৯৭৯ সালে তিনি দেশব্যাপী 'গণশিক্ষা অভিযান' শুরু করেন। এর লক্ষ্য ছিল বয়স্কদের অক্ষরজ্ঞান দান করা এবং দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করা।
* বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ: প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া রোধ করতে তিনি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের প্রথা শুরু করেন।
* মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন: তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে 'মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড' পুনর্গঠন করেন এবং সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেন।
* বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা: শিক্ষিত বেকার সমস্যা সমাধানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
* জাতীয় শিক্ষা কমিশন: শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন।
২. নারী ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন
বাংলাদেশে নারীদের ঘরের বাইরে এনে রাষ্ট্রগঠনের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ছিলেন অগ্রগামী। তাঁর উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো:
* মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ 'মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়' প্রতিষ্ঠা করেন, যা নারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়।
* চাকরিতে কোটা প্রবর্তন: সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি ১০% কোটা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের নারী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
* বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা: নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কুটির শিল্পে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য তিনি 'বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা' পুনর্গঠন ও সক্রিয় করেন।
* নারী পুলিশ নিয়োগ: বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে (পুলিশ) নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত তাঁর সময়েই গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়।
* পল্লী উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণ: গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ ও হাঁস-মুরগি পালনের মতো প্রকল্প হাতে নেন।
৩. খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে যুব সমাজ
নারীদের পাশাপাশি যুব সমাজের উন্নয়নেও তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি 'যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়' গঠন করেন। এর মাধ্যমে বেকার যুবকদের বিভিন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মূল প্রভাব : জিয়াউর রহমানের এই সংস্কারগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম জাতি গঠন করা। বিশেষ করে নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসার মাধ্যমে তিনি সমাজব্যবস্থায় এক ধরনের নীরব বিপ্লব শুরু করেছিলেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য ফিরিয়ে আনা ছিল তাঁর "বহুদলীয় গণতন্ত্র" প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ১৯৭৫ সালের জুনে প্রবর্তিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) থেকে বেরিয়ে এসে তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেন।
বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:
১. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার
১৯৭৫ সালের জুনে চারটি সরকারি পত্রিকা বাদে দেশের বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর এই বিধিনিষেধ তুলে নেন।
* সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন উন্মুক্তকরণ: তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদপত্রগুলো পুনরায় চালু করার অনুমতি দেন এবং নতুন সংবাদপত্র প্রকাশের ওপর থাকা কঠোর আইন শিথিল করেন।
* প্রেস কাউন্সিল গঠন: সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকতার মান বজায় রাখার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে তিনি 'বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল' (Bangladesh Press Council) গঠন করেন।
* সম্পাদকীয় স্বাধীনতা: সরকারের কড়া সমালোচনা করার সুযোগ উন্মুক্ত হয় এবং বিরোধী মতাদর্শের পত্রিকাগুলো (যেমন: দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ ইত্যাদি) স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে।
* গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন: তিনি সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
২. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ
একদলীয় শাসনের সময় বিচার বিভাগের ক্ষমতা অনেকাংশে সংকুচিত করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা এবং শক্তিশালী করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন:
* সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার: সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের যে ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছিল, তিনি পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের সেই হৃত গৌরব ও ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
* হাইকোর্ট বিভাগ শক্তিশালীকরণ: বিচারপ্রার্থীরা যাতে সহজে ন্যায়বিচার পায়, সেজন্য তিনি উচ্চ আদালতের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেন।
* বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা: বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
* আইনের শাসন: তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিচার বিভাগ অপরিহার্য। ফলে তাঁর সময়ে বিচারকগণ নির্বাহী বিভাগের চাপমুক্ত হয়ে কাজ করার অনেকটা সুযোগ পেয়েছিলেন।
৩. বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা
সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের এই স্বাধীনতা মূলত তাঁর 'বহুদলীয় গণতন্ত্র' (Multi-party Democracy) পুনঃপ্রবর্তনের অংশ ছিল। এর মাধ্যমে:
* রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন উন্মুক্ত করা হয়।
* মানুষের কথা বলার অধিকার এবং সভা-সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ পদক্ষেপ
* নিষিদ্ধ সংবাদপত্র চালু ও নতুন সংবাদমাধ্যম ডিক্লারেশন প্রদান।
* বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা।
* সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার।
* একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় সংসদীয় ধারায় ফেরা।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনধারা এবং তাঁর সৈনিক জীবন
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনধারা এবং তাঁর সৈনিক জীবন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং সাদামাটা, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। একজন সমরনায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পথচলায় তাঁর এই ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল অনুকরণীয়।
জীবনের বিশেষ দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. ব্যক্তিগত জীবনধারা (সাদামাটা জীবন)
জিয়াউর রহমান তাঁর মিতব্যয়ী এবং সাধারণ জীবনযাপনের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তাঁর চলন-বলনে কোনো আভিজাত্যের ছাপ ছিল না।
* পোশাক-পরিচ্ছদ: তিনি সাধারণত সাদা সাফারি বা বুশ শার্ট পরতেন। তাঁর ব্যবহৃত ছেঁড়া গেঞ্জি বা সাধারণ আসবাবপত্রের গল্প আজও বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে, যা তাঁর নির্লোভ চরিত্রের প্রমাণ দেয়। * খাদ্যাভ্যাস: তিনি অত্যন্ত সাধারণ খাবার পছন্দ করতেন এবং বিলাসবহুল ভোজ এড়িয়ে চলতেন। * কঠোর পরিশ্রম: তিনি প্রতিদিন গড়ে ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ করতেন। গভীর রাত পর্যন্ত ফাইলে সই করা বা ভোরে উঠে খাল খনন কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া ছিল তাঁর নিয়মিত রুটিন। * পারিবারিক জীবন: স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দুই পুত্র (তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো)-কে নিয়ে তাঁর ছিল এক নিভৃত পরিবার। তিনি পরিবারকে রাজনীতির চেয়ে দূরে রাখার চেষ্টা করতেন।
২. সৈনিক জীবন ও পেশাদারিত্ব
একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ।
* সাহসিকতা (১৯৬৫-এর যুদ্ধ): ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে তিনি একটি কোম্পানির নেতৃত্ব দেন। তাঁর অসীম সাহসিকতার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে 'হিলাল-ই-জুরাত' (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক) প্রদান করে।
* মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন: ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ চট্টগ্রামে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি 'জেড ফোর্স'-এর অধিনায়ক হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি 'বীর উত্তম' উপাধি পান।
* শৃঙ্খলার প্রতীক: সেনাবাহিনীতে তিনি কঠোর শৃঙ্খলার পক্ষে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীই দেশের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি।
* নির্ভীক কমান্ডিং: যুদ্ধের ময়দানে তিনি সবসময় সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করতেন, যা তাঁর অধীনস্থ সৈনিকদের মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিত।
৩. জীবনদর্শন "দেশপ্রেম"
তাঁর সৈনিক এবং রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি ছিল দেশপ্রেম। তিনি বলতেন, "ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ বড়।" তাঁর সততা এবং একনিষ্ঠতা বিরোধীদের কাছেও প্রশংসিত ছিল।
একটি স্মরণীয় তথ্য
শহীদ জিয়ার শাহাদাত বরণের পর যখন তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ পরীক্ষা করা হয়েছিল, তখন দেখা গিয়েছিল তাঁর নিজের নামে কোনো বাড়ি বা ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল না। তাঁর একমাত্র সম্পত্তি ছিল তাঁর সততা এবং দেশপ্রেম।

পড়লাম। সমৃদ্ধ লেখা
উত্তরমুছুন