রবীন্দ্রনাথের নাটক, নাটকের রবীন্দ্রনাথ / সুশোভন ইফতেখার
বাঙালী সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। তিনি কেবল গতানুগতিক নাট্যকাহিনি নয়, বরং নাটকের আঙ্গিক ও উপস্থাপনায় নিয়ে এসেছিলেন বৈচিত্র্য। তাঁর নাটকগুলোকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য
রবীন্দ্রনাথের নাট্যচর্চার শুরু গীতিনাট্য দিয়ে। এখানে গানের মাধ্যমেই নাটকের ভাব প্রকাশিত হয়। শেষের দিকে তিনি তৈরি করেন 'নৃত্যনাট্য', যেখানে নাচ, গান ও অভিনয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়।
গীতিনাট্য: বাল্মীকি-প্রতিভা (তাঁর প্রথম গীতিনাট্য), কালমৃগয়া, মায়ার খেলা।
নৃত্যনাট্য: চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, শ্যামা।
২. কাব্যনাট্য
এই নাটকগুলো মূলত কাব্যিক ঢঙে লেখা এবং এখানে সংলাপের চেয়ে ভাবের গভীরতা বেশি।
উল্লেখযোগ্য: বিসর্জন, রাজা ও রানী, মালিনী, বিদায়-অভিশাপ। এর মধ্যে 'বিসর্জন' তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যনাট্য।
৩. রূপক-সাংকেতিক নাটক
রবীন্দ্রনাথের নাটকের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং গভীর অংশ হলো তাঁর রূপক বা সাংকেতিক নাটক। এগুলোতে সরাসরি কোনো গল্পের চেয়ে প্রতীকের মাধ্যমে গভীর জীবনদর্শন বা আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য: ডাকঘর, রক্তকরবী, মুক্তধারা, রাজা, অচলায়তন, ফাল্গুনী।
রক্তকরবী: যান্ত্রিক সভ্যতা ও শোষণের বিরুদ্ধে মানবিকতার জয়ের গল্প।
ডাকঘর: বন্দী জীবনের মুক্তি এবং অজানাকে জানার ব্যাকুলতা।
৪. প্রহসন ও কৌতুকনাট্য
হাস্যরসের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের ভুলত্রুটি তুলে ধরতে তিনি বেশ কিছু প্রহসন লিখেছিলেন।
উল্লেখযোগ্য: গোড়ায় গলদ, বৈকুণ্ঠের খাতা, চিরকুমার সভা, শেষরক্ষা।
৫. সামাজিক ও অন্যান্য নাটক
উল্লেখযোগ্য: তপতী, বাঁশরি, গৃহপ্রবেশ।
একটি মজার তথ্য : রবীন্দ্রনাথ কেবল নাটক লিখতেনই না, তিনি নিজে সেই নাটকে অভিনয়ও করতেন এবং নাটকের নির্দেশনা দিতেন। যেমন, বিসর্জন নাটকে তিনি বিভিন্ন সময়ে রঘুপতি ও জয়সিংহ—উভয় চরিত্রেই অভিনয় করেছেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন