টেবিল টকের রণকৌশল: যখন দিল্লির দরবারে অকুতোভয় ছিলেন জিয়াউর রহমান / সুশোভন ইফতেখার শাওন
ইতিহাসের পাতায় অনেক সময় এমন কিছু অনানুষ্ঠানিক ঘটনা বা ‘টেবিল টক’ থেকে যায়, যা কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। ১৯৭৭ সালের ২০ ডিসেম্বর। স্থান: ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন। তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গিয়েছেন বাংলাদেশের তৎকালীন তরুণ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ভারতের ঝানু ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদেরা তখন বাংলাদেশের এই ৪১ বছর বয়সী রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রটোকল অনুযায়ী সর্বোচ্চ সম্মান দিচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ব্যাকস্টেজে ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক ও নাটকীয় ঘটনা আজও বহুল চর্চিত।
পটভূমি: গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি ও দিল্লির অস্বস্তি
প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই সফরের ঠিক এক মাস আগে, ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কূটনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই, রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো ঝানু নেতাদের সামনে বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক সাফল্য ভারতের অনেক নীতিনির্ধারকের মনেই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অস্বস্তি তৈরি করেছিল।
প্রটোকল ভেঙে প্রশ্ন এবং একটি বিস্ফোরক উত্তর
রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসেন ভারতের তৎকালীন প্রভাবশালী ও দীর্ঘকালীন কেবিনেট মন্ত্রী জগজীবন রাম। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য এবং প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ প্রটোকলের আতিথেয়তা হয়তো তাঁর মনঃপুত ছিল না। প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে তিনি সরাসরি প্রেসিডেন্ট জিয়াকে প্রশ্ন করে বসেন:
"আপনি কি কখনো বাংলাদেশ ও ভারতের জনসংখ্যা এবং সামরিক শক্তির তুলনা করে দেখেছেন? তাহলে বাংলাদেশ দখল করতে ভারতের কত সময় লাগবে, সেটা কি হিসাব করেছেন?"
কথিত আছে, এমন চরম উসকানিমূলক এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত প্রশ্নের মুখে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। নিজের স্বভাবসুলভ সানগ্লাসের আড়াল থেকে তীব্র ও আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি জবাব দেন:
"আমি হিসাব করেছি। তবে আপনাদের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ আমাদের ভূখণ্ড দখল করার আগেই আমাদের ছেলেরা ভারতের প্রধান ৬টি বড় শহর মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেবে। আর ভুলে যাবেন না, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে (পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা টেনে) আমরা ভারতকে পরাস্ত করেছিলাম!"
জিয়ার এই অকুতোভয় ও ক্ষিপ্র জবাবে জগজীবন রাম স্তব্ধ হয়ে যান এবং ক্ষোভে বৈঠক ত্যাগ করতে উদ্যত হন। অসমাপ্ত সেই নাটকীয়তার রেশ ধরে জিয়াউর রহমান নাকি পেছন থেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কোন ৬টি শহর ধ্বংস করা হবে, তা জানতে চাইলেন না?"
কূটনৈতিক সুনামি ও জিয়ার শীতল মস্তিষ্ক
রাষ্ট্রপতি ভবনের বদ্ধ ঘরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা মুহূর্তে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল হক এবং পানি বিশেষজ্ঞ বি এম আব্বাসসহ অন্য কর্মকর্তারা সম্ভাব্য কূটনৈতিক সংকটের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী স্বয়ং প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাথে দেখা করেন। কিন্তু সেখানেও জিয়াউর রহমান দেখান তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। পুরো বিষয়টিকে তিনি একটি হালকা চালের রসিকতা বা 'ফান' হিসেবে উল্লেখ করে পরিস্থিতি শান্ত করেন। তিনি বুঝিয়ে দেন—বাংলাদেশ যেমন আক্রমণাত্মক নয়, তেমনি নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেও প্রস্তুত নয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই কথোপকথনের কোনো আনুষ্ঠানিক বা দাপ্তরিক রেকর্ড দুই দেশের আর্কাইভে পাওয়া যায় না। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যে আপসহীন ও দৃঢ় অবস্থান ছিল, লোকমুখে প্রচলিত এই ঘটনাটি তারই একটি প্রতীকী প্রতিফলন হিসেবে টিকে আছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর শাহাদাত বরণের পরও, এই ধরনের গল্পগুলো আজও নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিদের মনে এক অদম্য বারুদ ও দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা জোগায়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন