জিয়াউর রহমান: এক জননায়ক ও কুৎসার রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ / সুশোভন ইফতেখার শাওন

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে কোনো গণ্ডিবদ্ধ সংজ্ঞায় আটকে রাখা অসম্ভব। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তাঁকে 'রুথলেস সামরিক শাসক' হিসেবে চিত্রায়িত করতে চাইলেও, ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—জিয়া ছিলেন এ দেশের ইতিহাসের একমাত্র 'মুক্তিযোদ্ধা শাসক'। অথচ আশ্চর্য বিষয়, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো কিংবা মিসরের গামাল আব্দেল নাসেরকে তাঁদের দেশের মানুষ সামরিক শাসক হিসেবে দেখে না; দেখে ট্রেইলব্লেজার বা জাতীয় বীর হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশে সার্বভৌমত্বের এই প্রধান প্রতীককে ভিলেন বানানোর এক পরিকল্পিত অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।

‎স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে 'ম্যান অব অ্যাকশন'

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ যখন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছিল, তখন সমস্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা পাশ কাটিয়ে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি কেবল ঘোষণাকারীই ছিলেন না, সম্মুখসমরের সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালেও দেশের চরম সংকটে তিনি 'ম্যান অব অ্যাকশন' হিসেবে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

‎তথাকথিত সামরিক শাসন বনাম জিয়ার ডিকলোনাইজেশন

‎আইয়ুব খান বা ইয়াহিয়া খানের প্রথাগত সামরিক শাসনের সাথে জিয়ার শাসনকালকে মেলানো এক ঐতিহাসিক ভুল।

‎গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের মুক্তি : বাকশালের মাধ্যমে যেখানে সমস্ত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল, জিয়া এসে গণমাধ্যমকে মুক্ত করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

‎তরুণ প্রজন্ম ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ : তিনি রক্ষীবাহিনীর মতো বিতর্কিত বাহিনী না গড়ে, দেশের তরুণ প্রজন্মকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করেছিলেন। এফডিসি, পিআইবি এবং প্রেস কাউন্সিলের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তাঁরই অবদান।

‎উন্নয়নের দেশীয় দর্শন : যেখানে প্রথাগত সামরিক শাসকেরা মেগা প্রজেক্টের মোহে অন্ধ থাকে, সেখানে জিয়া হেঁটেছেন ডিকলোনাইজেশনের পথে। ব্রিটিশদের ধ্বংস করা প্রাচীন সেচব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন, যা ছিল সম্পূর্ণ গণমুখী।

‎জাতীয়তাবাদী ঐক্য ও ভূ-রাজনীতি

‎জিয়াউর রহমান ছিলেন এক অনন্য রাজনৈতিক জাদুকর। তিনি মুসলিম লীগ থেকে শুরু করে মাওবাদী—সব বিপরীতমুখী স্রোতকে এক সুতোয় গেঁথে 'বাংলাদেশপন্থি' এক ইস্পাতকঠিন জাতীয়তাবাদী ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁর কঠোর অবস্থান এবং সেভেন সিস্টারস নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতা আজীবন বিদেশি প্রভু ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের মাথাব্যথার কারণ ছিল। ‎এমনকি জিয়া কখনো শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করেননি, যার প্রমাণ ১৯৭২ সালের 'বিচিত্রা' পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’। উল্টো তিনি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দিয়েছিলেন। অথচ কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে এক ধরনের প্রতিহিংসার রাজনীতি তাঁর কপালে 'সামরিক স্বৈরাচার'-এর তকমা সেঁটে দিতে চেয়েছে।

শেষকথা

‎জিয়াকে সামরিক শাসক বলা আর সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবের নায়কদের খুনি ফারুক-রশিদের সাথে তুলনা করা একই ধরনের বয়ানের শয়তানি। জিয়াউর রহমান জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান 'মুক্তিযোদ্ধা সংসদ' ও 'স্বাধীনতা পদক'। তাই ইতিহাসের পাতা থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলার বা তাঁকে খলনায়ক বানানোর যেকোনো বিদেশি ও দেশি চক্রান্ত এ দেশের দেশপ্রেমিক জনতা চিরকাল প্রত্যাখ্যান করেছে এবং করবে।

‎আমরা জিয়ার সৈনিক—এই হোক সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শহীদ জিয়ার জীবন রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ / সুশোভন ইফতেখার শাওন

‎ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: স্বৈরাচারের পরিণতি ও পতনের অমোঘ নিয়ম / সুশোভন ইফতেখার শাওন

হাজারটা নমরুদ মরলে একটা হাসিনার জন্ম হয় : মাস্টার লায়ারের শেষ মিথ্যাও ফাঁস / সুশোভন ইফতেখার