দিল্লির 'মন্ত্রী' চাল বনাম ভিয়েনা কনভেনশন: কূটনীতি কি ইগোর খেলা?
গত এক বছরে অন্তত নয়বার ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বারবার এই 'হেডমাস্টারের রুমে' হাজিরা দেওয়ার বিষয়টি যে দিল্লির কূটনৈতিক ইগোতে বেশ বড়সড় আঘাত করেছে, তা স্পষ্ট। আর সেই ইগো ঢাকতেই সাউথ ব্লক এবার এক নতুন 'চাণক্য চাল' চেলেছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে 'ক্যাবিনেট মন্ত্রীর' তকমা দিয়ে। দিল্লির হিসাব হয়তো সরল—মন্ত্রী পর্যায়ের কাউকে তো আর ঢাকা কথায় কথায় তলব করে কৈফিয়ত চাইতে পারবে না!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক কূটনীতি কি দিল্লির এই ঘরোয়া রাজনৈতিক সমীকরণে চলে? নাকি এটি কেবলই একটি সস্তা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare)?
আইনি বাস্তবতা ও ভিয়েনা কনভেনশন :
দিল্লির এই তথাকথিত 'মাস্টারস্ট্রোক' আন্তর্জাতিক আইনের কষ্টিপাথরে একেবারেই টিকবে না। ১৯৬১ সালের **'ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস'**-এর কোথাও এমন কোনো নিয়ম নেই যে, কোনো দেশ তার দূতকে ঘরোয়াভাবে 'মন্ত্রী' বা 'মহারাজা' উপাধি দিলে হোস্ট কান্ট্রি (যে দেশে তিনি নিযুক্ত) তাকে তলব করতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রদূতের পদমর্যাদা সম্পূর্ণ 'প্রতিনিধিত্বমূলক' (Representative Status)। ভারত সরকার তাকে নিজেদের ক্যাবিনেটে কী মর্যাদা দিল, আন্তর্জাতিক আইনের টেবিলে তার আইনি মূল্য শূন্য। বাংলাদেশে তিনি স্রেফ ভারতের একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধি, কোনো ঔপনিবেশিক আমলের 'ভাইসরয়' নন। কূটনীতির ভাষায় একে বলা যায় **'অ্যাসিমেট্রিক ডিপ্লোমেসি'** বা অসম কূটনীতির মোড়কে একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা।
ঢাকার কৌশল কী হওয়া উচিত ? :
দিল্লির এই ফাঁকা বুলিতে ঢাকার ঘাবড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের উচিত হবে অত্যন্ত পেশাদার ও সোজা পথে হাঁটা:
কূটনৈতিক প্রটোকল বজায় রাখা:
ভারতের অভ্যন্তরীণ পদবি যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশ তাকে আন্তর্জাতিক আইন মেনেই একজন বিদেশি কূটনীতিক হিসেবে গণ্য করবে।
তলবের অধিকার সমুন্নত রাখা:
দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ বা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যখনই প্রয়োজন হবে, ঢাকা তার 'ডিমার্শে' (Démarche) বা তলব করার অধিকার বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই প্রয়োগ করবে।
মনস্তাত্ত্বিক চাপ উপেক্ষা করা:
দিল্লির এই 'চাণক্যনীতি' বা প্রচারণাকে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো প্রভাব ফেলতে দেওয়া যাবে না।
সোজা কথা সময় বদলেছে। 'ক্যাবিনেট মন্ত্রীর' সিলমোহর লাগিয়ে হয়তো দিল্লির নিজস্ব মিডিয়ায় কলার উঁচু করা যাবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাঠের সমীকরণ তাতে বদলায় না। নীতিভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সমতা সবার জন্য সমান। তাই প্রয়োজনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তলব পড়লে, 'মন্ত্রী' তকমাধারী হলেও নিয়ম মেনে তাকে হাজিরা দিতেই হবে।
সুশোভন ইফতেখার শাওন

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন